সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারটা মূলত রাজনৈতিক

রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য অনেক কারণেই জরুরি। বিশেষভাবে জরুরি তিনি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে। রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলেছেন। কিন্তু সেটা একটা বিশেষ ধরনের জাতীয়তাবাদ; সেটির চরিত্র পুঁজিবাদী, আচরণ সাম্রাজ্যবাদী। আরেক ধরনের জাতীয়তাবাদ আছে; সেটি আত্মপরিচয়ের ও আত্মরক্ষার, এ জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও।
রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন এর পক্ষে কাজ করেছেন। বাঙালির জাতীয় সত্তার বিকাশ; জাতীয় পরিচয় সুসংহতকরণ এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা তুলনাবিহীন।
বাঙালির জাতীয়তাবাদের শত্র“ ছিল দুটি। একটি বাইরের, অপরটি ভেতরের। বাইরেরটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ও
অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। রবীন্দ্রনাথ এ শত্র“র বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সজাগ করতে চেষ্টা করেছেন। ভেতরের শত্র“ ছিল সাম্প্রদায়িকতা এবং শ্রেণি বিভাজন। দু’য়ের ভেতর সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, এবং তারা উভয়েই নিজ নিজ পদ্ধতিতে সক্রিয় ছিল।
সাম্প্রদায়িকতার ব্যাপারটা মূলত রাজনৈতিক; ব্রিটিশের দুঃশাসন নিরন্তর প্রচেষ্টায় তাকে বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের উসকানি ভীষণভাবে কার্যকর ছিল। জনগণের মুক্তিকামী স্বাধীনতা আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক শর্ত ছিল সাম্প্রদায়িকতার অবসান ঘটানো। সেটা করা গেলে শ্রেণি সমস্যার সমাধানের দিকে এগোনো যেত। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। কংগ্রেসের হিন্দু মহাসভাপন্থী অংশ, লীগের স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী এবং প্ররোচনাদানকারী ব্রিটিশÑ এই তিনে মিলে বাংলাকে ভাগ করে ছেড়েছে।
এটি রাষ্ট্রীয় বিভাজন। এর আগে ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক বিভাজনের আয়োজন করা হয়েছিল; রবীন্দ্রনাথ তার বিরোধিতা করেছেন, এবং এটা দেখে হতাশ হয়েছে এই আন্দোলন যে উগ্রপন্থীদের হাতে চলে গেছে তাদের কার্যক্রম সাম্প্রদায়িকতাকে স্তিমিত না করে উল্টো প্রজ্জ্বলিত করছে। এ নিয়ে তার উদ্বেগ ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। বাঙালির ঐক্য ও মুক্তি তিনি সর্বতোভাবে কামনা করেছেন; সে জন্য সাম্প্রদায়িকতা তো অবশ্যই শ্রেণিদূরত্বও ঘোচাতে চেয়েছেন। পারেননি। সে-ব্যর্থতা তার নয়। তার দেশবাসীর।
আরও অনেক কারণেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য জরুরি, এবং জরুরি থাকবেন। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করব, তার পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেয়া অব্যাহত রাখব। রবীন্দ্রনাথ অনেক বিষয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, বহু ক্ষেত্রে। শান্তিনিকেতনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে ছাত্র ও অধ্যাপক এসেছে পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়। যে-বহুমুখীনতাকে আধুনিক ইউরোপ তার জন্মকালে অত্যন্ত প্রশংসা করত, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সেই গুণ ছিল, তার আগে অন্য কোনো বাঙালির মধ্যে এটা দেখা যায়নি, পরেও দেখা যাবে বলে আশা করা যায় না, কেননা ইতোমধ্যে যুগ এসে গেছে বিশেষজ্ঞ হওয়ার। রবীন্দ্রনাথ কেবল বৃহৎ নন, বৃহৎ তো তিনি অবশ্যই, তিনি মহৎও। তার সেই মহত্ত্বের নানা মাত্রা রয়েছে।
সবচেয়ে প্রথম বৈশিষ্ট্য অবশ্য সৃষ্টিশীলতা। অমন সৃষ্টিশীলতা বাঙালির মধ্যে দুর্লভ তো বটেই, কিন্তু এটি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। পেছনে ছিল কঠোর পরিশ্রম। শিক্ষিত বাঙালি যে পরিশ্রমপ্রিয় নয় এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। রবীন্দ্রনাথ অবকাশের আবশ্যকতার কথা অনেকভাবে বলেছেন, কিন্তু তাই বলে আলস্য বা অল্পে সন্তুষ্টির প্রশ্রয় তার মধ্যে ছিল এমনটা মোটেই সত্য নয়। বাংলার কৃষক খুবই পরিশ্রমী, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সেই একই শ্রমশীলতা দেখি আমরা; কিন্তু কৃষক বাধ্যতামূলকভাবেই স্বল্পে সন্তুষ্ট, রবীন্দ্রনাথ যেটা ছিলেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *