আমার শৈশব দে ফিরিয়ে দে…

আজও চোখ বন্ধ করলে মনে পড়ে ফেলে আসা সেই শৈশবের দিনগুলোর কথা। কতই না মধুর ছিল হারানো সেই দিনগুলো! এখনও মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে বড্ড ইচ্ছে হয়।
আমরা যারা দুই হাজার সালের কিছু আগে বা পরে জন্মেছি, তারাই যথাসম্ভব শেষ প্রজন্ম হিসেবে গ্রাম্য আবহে স্মৃতিমধুর এক সোনালি শৈশব পেয়েছি। তাই আমরা নিজেদের বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে অনেক ভাগ্যবান বলেও মনে করতে পারি।
আমাদের সময়ে ছিল না এত আধুনিকতার ছোঁয়া। জীবনযাত্রার মানও খুব একটা উন্নত ছিল না। ছিল না ইন্টারনেট, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা। তারপরও আমরা আমাদের শৈশব নিয়ে গর্ব করতে পারি। কারণ, আমরাই গত শতাব্দীর শেষ প্রজন্ম, যারা বলার মতো একটা শৈশবের সাক্ষী হয়েছি।

তখন ছিল না একক পরিবারের ব্যাপকতা। সর্বত্রই বিরাজমান ছিল যৌথ পরিবারের। তাই আমাদের স্নেহের কোনো কমতি ছিল না। সবার কোলেপিঠে আমাদের ছেলেবেলা ছিল আল্লাদে আটখান। আমরা দলবেঁধে এপাড়া-ওপাড়ায় ঘুরতাম। পুকুরে স্নান করতাম। একে-অপরের সঙ্গে কাদামাটি ছুড়াছুড়ি করতাম। অল্প পানিতে মাছ ধরতাম। লাটিম ঘুরাতাম। নীল আকাশে ঘুড়ি উড়াতাম। বেয়ারিংয়ের গাড়ি বানিয়ে গোটা পাড়া চষে বেড়াতাম। মাটির মার্বেল বানিয়ে আগুনে পুড়তাম। রেললাইনে পেরেক চাপা দিয়ে চাকু বানাতাম।
আমরা ছিলাম অনেক বেশি চঞ্চল। ঘরে বন্দি থাকতাম না। বিকেল হলেই সবাই মাঠে দলবদ্ধ হতাম। তখন মাঠের অভাব ছিল না। এখনকার মতো এত ঘনবসতি ছিল না। তাই আমাদের খেলার জায়গার অভাব ছিল না। আমরা বেশিরভাগ সময় গোল্লাছুট, গাদল ও বউচি খেলতাম। আবার কখনো কখনো ছোট-বড় সবাই মিলে লুকোচুরি খেলায় মেতে থাকতাম।
এছাড়াও ডাংগুলি, বউ-জামাই, বাঁদর ঝোলা, দড়ি লাফ, কানামাছি, সুপারিপাতার গাড়ি, খোলাবাড়ি, মোরগ লড়াই, কুতকুত, চোর-পুলিশ, টায়ার খেলাসহ মজার মজার নানা খেলায় সুমধুর দিন কাটাতাম।
শৈশবের চরম দুরন্তপনায় আমরা যখন যা খুশি করতাম। মাঝেমধ্যেই সবাই একত্রিত হয়ে জুলাভাতির আয়োজন করতাম। প্রত্যেকের বাড়ি থেকে চাল আর ডিম সংগ্রহ করতাম। বড়রা রান্না উঠাতো, আর ছোটরা আমরা খড়কুটো জোগাড় করে আনতাম। রান্না শেষে সবাই একসঙ্গে কলাপাতায় খাওয়ার স্বাদ নিতাম। আমরাই সেই প্রজন্ম, যারা এক টাকায় চারটি চকলেট কিনেছি। ৫০ পয়সার আইসক্রিম কিনে খেয়েছি। ভাঙারি বিক্রি করে কটকটি খেয়েছি। কলম খেলাছি। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে খেলা করেছি। গাছের মগডালে দাপড়িয়ে বেড়িয়েছি। কলাগাছের ভেলা বানিয়ে নদীতে ভেসে বেড়িয়েছি। রাতের আঁধারে হারিকেন জ্বালিয়ে বই পড়তে বসেছি।
আমাদের শৈশবটা ছিল স্মৃতিমধুর। কোনো কিছুর কমতি ছিল না। গ্রাম্য আবহে শৈশবের পুরোটাই আমরা সানন্দে কাটিয়েছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতা আর সামাজিক মূল্যবোধ শিখেছি। সমাজের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি। কিন্তু এখনকার শিশুদের দিন কাটে আবদ্ধ ঘরে। টেলিভিশনে কার্টুন দেখে, মোবাইলে গেমস খেলে। ফলে একদিকে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে একঘেয়েমি, অন্যদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রবণতা।
শিশুরা এখন বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার খুব একটা সুযোগ পায় না। এ কারণে তাদের মনোজগৎ বিকাশে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। শিশুরা সোনালি শৈশবের উদ্দীপনায় বড় হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাইতো এখনকার শিশুদের জন্য বড্ড আফসোস হয়। তাদের জন্য আমাদের ফেলে আসা সোনালি শৈশব এনে দিতে সাধ জাগে। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব? আর বলেতে ইচ্ছা করে, আমার শৈশব দে ফিরিয়ে দেৃ
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *