‘০০৭ বন্ড’ ও ২৬ পরিবারের অনন্ত কান্না

-প্রভাষ আমিন
বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনা, মামলা, বিচার, রায় সবকিছুই নাটকীয়। সব আলোচনার কেন্দ্রে একজন নারী–নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। তিনি দোষী না নির্দোষ, নি¤œ আদালতের রায় ঠিক না ভুল, উচ্চ আদালতে গেলে রায় টিকবে কী টিকবে না, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনও নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি–ঘুরেফিরে মিন্নি সংক্রান্ত ইত্যাকার প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ অধিকাংশ আলোচনা। কিন্তু মিন্নি সব মনোযোগ কেড়ে নেওয়ায় এই ঘটনার আরও অনেক দিক আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে।
দিনের বেলায় সবার সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার নির্মমতা আর সবার মতো আমাকেও আতঙ্কিত করেছে, বেদনার্ত করেছে। কিন্তু এই ঘটনায় যারা অভিযুক্ত এবং দ-িত; তাদের জন্যও আমার কষ্ট হচ্ছে। অপরাধীদের জন্য কেন কষ্ট হচ্ছে, সেটা বলার আগে চলুন একটু অঙ্ক করে আসি। রিফাত শরীফ হত্যার মামলাটির বিচার চলছিল দুটি আলাদা আদালতে। দুদিন আগে বরগুনার একটি আদালতে এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে ১০ আসামির মধ্যে ৬ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে, বাকি ৪ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিলে গেলে ৬ আসামির ফাঁসির দ- যেমন বদলে যেতে পারে, তেমনই বদলে যেতে পারে বেকসুর খালাস পাওয়া ১০ আসামির রায়ও। মনে রাখুন সংখ্যাটি-১০। একই মামলায় শিশু আদালতে বিচার হচ্ছে, যেখানে আসামি ১৪ জন। তাদের বিচার শিশু আদালতে হচ্ছে, কারণ এই ১৪ জনের বয়স ১৮-এর কম। তার মানে রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় মোট অভিযুক্ত ২৪ জন। আর মূল যে অভিযুক্ত, সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ডকে হত্যা করা হয়েছে ক্রসফায়ারের নামে। এদিকে গতবছরের ২৬ জুন রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার মানে একটি ঘটনায় বরগুনার মতো একটি ছোট জেলা শহরের ২৬টি পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। ২ জন মারা গেছে। ৬ জন ফাঁসির রায় নিয়ে কনডেম সেলে আছে। বেকসুর খালাস পাওয়া ৪ জনের অনিশ্চয়তাও শেষ হয়নি। ১৪ শিশু এখনও রায়ের অপেক্ষায় আছে। ভাবা যায়!
যেটা বলছিলাম, নির্মম হত্যাকা-ের শিকার রিফাত শরীফের জন্য তো আমার বেদনা আছেই, বেদনা আছে অভিযুক্ত ও দ-িত ২৪ জনের জন্যও। দ্ইু আদালত মিলে ২৪ আসামির মধ্যে ১৪ জনের বয়স তো ১৮ বছরের নিচে। বিচার হয়ে যাওয়া ১০ জনের বয়সও কিন্তু ২২-এর বেশি নয়। তার মানে অভিযুক্ত ও দ-িত সবাই শিশু বা কিশোর। এই বয়সেই এরা কীভাবে এমন ভয়ঙ্কর খুনি হয়ে উঠলো, সেই প্রশ্নটির উত্তর জানা খুব জরুরি। রিফাত হত্যা নিছক এক নারীর দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টির জের। এই ঘটনায় সরাসরি কোনও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা ইন্ধন নেই বটে। তবে তারা কীভাবে এমন ভয়ঙ্কর খুনি হয়ে উঠলো, সেই প্রশ্নের উত্তরেই আসবে রাজনীতির প্রশ্ন। নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারের নামে খুন করা হলেও তার ২৪ অনুসারী এখন হয় দ-িত নয় অপেক্ষমাণ। কিন্তু রিফাত হত্যার পর জানা গেছে, সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড ফেসবুকে ‘০০৭ বন্ড’ নামে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিতো। এই গ্রুপের সদস্য ছিল ১২৬ জন। যারা মাদক গ্রহণ, মাদক ব্যবসা, মারামারি, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়মিতই করতো। ভয়ে তাদের কেউ কিছু বলতো না। এখানেই রাজনীতি। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই শিশু বা কিশোরদের পক্ষে এই বয়সেই এমন দানব হয়ে ওঠা সম্ভব হতো না। যখন কেউ জানে যে অপরাধ করলে তাকে বাঁচানোর জন্য ‘বড় ভাই’ আছেন, তখন সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ধরুন, রিফাত শরীফ হত্যাই তো নয়ন বন্ড গ্রুপের প্রথম অপরাধ নয়। তারা অনেকদিন ধরেই নানা অপরাধ করে হাত পাকাচ্ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তাদের কেউ নিবৃতও করেনি, কারও সাজাও হয়নি। তাতেই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে যায় এবং দিনের বেলায় সবার সামনে খুন করতেও তাদের হাত কাঁপেনি। ভাবুন একবার, সেদিন যদি রিফাত মারা না যেতেন, তাহলেই কিন্তু ঘটনা এতদূর গড়াতো না। টুকটাক মারামারি স্থানীয়ভাবেই মিটে যেতো। অথবা এই হত্যাকা-টি যদি এভাবে সবার সামনে না হতো বা সেখানে কোনও সিসিটিভি ফুটেজ না থাকতো; তাহলেও কিন্তু ঘটনা এতদূর গড়াতো না। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকলেই আসামিদের অনেকেই বেঁচে যেতে পারতো। তেমন হলে কিন্তু নয়ন বন্ড আরও বেপরোয়া হয়ে যেতো।

এই ‘নয়ন বন্ড’রা কিন্তু শুধু বরগুনার সমস্যা নয়। বরগুনাতেও নিশ্চয়ই এমন আরও গ্রুপ আছে। দেশের প্রতিটি জেলায় ‘নয়ন বন্ড’রা আছে। এবং সব জায়গাতেই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাতেই তারা দানব হয়ে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাং এখন সব জায়গাতেই আতঙ্কের নাম। কয়েক বছর আগে ঢাকার উত্তরায় এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনায় কিশোর গ্যাং কালচার আলোচনায় আসে। তখন জানা যায়, শুধু ঢাকাতেই কিশোর গ্যাং আছে ৬০টি। শুধু বরগুনা নয়, সব জেলা, এমনকি উপজেলাতেও একাধিক কিশোর গ্যাং আছে। তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, মাদক নেয়, ছিনতাই করে। আর রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’য়ের হয়ে লাঠিবাজি করে। সেই বড় ভাইয়েরাই তাদের রক্ষাকবচ। এই বড় ভাইয়েরা আছে বলেই পুলিশ এদের কিছু বলে না বা বলতে পারে না। যখন খুনাখুনি পর্যায়ে চলে যায়, তখন আমরা একটু নড়েচড়ে বসি। কিছুদিন আলোড়ন। তারপর আবার সব থিতিয়ে যায়। ‘নয়ন বন্ড’রা আবার তাদের অপরাধ চালিয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত আরেকজন রিফাত শরীফ খুন না হবে, ততক্ষণ আমাদের হুঁশ হবে না।
প্রথম কথা হলো, সাব্বির আহমেদদের নয়ন বন্ড হয়ে ওঠা বন্ধ করতে হবে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। আপনি যতই নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ার করেন, তার সহযোগীদের ফাঁসি দেন; লাভ নেই। নয়ন বন্ড হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা বন্ধ করতে না পারলে, দ্রুতই তাদের শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যাবে। নতুন বন্ডরা নেতৃত্বে চলে আসবে। জাতির স্বার্থেই সব ধরনের অপরাধ বিশেষ করে কিশোর অপরাধের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের পুলিশের ওপর আমার আস্থা আছে। আপনারা রাজনৈতিক আশীর্বাদ তুলে নিয়ে দেখুন, পুলিশ এক সপ্তাহের মধ্যে সব অপরাধীকে ধরে ফেলবে।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *