‘চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়’

মহাকাল ডেস্ক

‘চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়/ আমার ঠোঁট শুকনো হয়ে আসে, বুকের ভেতরটা ফাঁকা/ আত্মায় অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পতনের শব্দ/ শৈশব থেকে বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস…/ বলিভিয়ার জঙ্গলে নীল প্যান্টালুন পরা/ তোমার ছিন্ন ভিন্ন শরীর/ তোমার খোলা বুকের মধ্যখান দিয়ে/ নেমে গেছে/ শুকনো রক্তের রেখা…।’ কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ এই কবিতায় সশ্রদ্ধ উচ্চারণের মত সারা বিশ্বের লক্ষ-কোটি মানুষের মাথা চে স্মরণে নত হয়ে আসে।
বিপ্লবের সেই অগ্নিপুরুষ চে গুয়েভারার মৃত্যুদিবস আজ ৯ অক্টোবর।চে গুয়েভারা ইতিহাসের এক নন্দিত চরিত্র। বিভিন্ন জীবনী, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, তথ্যচিত্র, গান ও চলচ্চিত্রে তার চরিত্রের নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও টাইম পত্রিকার বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় তার নাম প্রকাশিত হয়।

১৯৬৭ সালের ৯ ই অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী এবং গেরিলা নেতা চে গুয়েভারা ৩৯ বছর বয়সে বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে মার্কিন- সামরিক এক বলিভিয়ান বাহিনী বলিভিয়ায় তার গেরিলা ব্যান্ডের সাথে লড়াই করতে গিয়ে ৮ অক্টোবর গুয়েভারাকে ধরে নিয়ে যায় এবং পরের দিন তাঁকে হত্যা করে। মৃত্যুর প্রমাণ হিসাবে তাঁর হাত কেটে ফেলা হয়েছিল এবং তাঁর মৃতদেহ একটি চিহ্নহীন কবরে সমাহিত করা হয়েছিল।

একাধিক সূত্রের মতে ১৯৯৭ সালে তার দেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এবং সেই সময় তাঁর দেহ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হলেও তা নিতে অস্বীকার করে।

গুয়েভারা ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে কিউবার সরকারী পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন – সম্ভবত তিনি কাস্ত্রোর সাথে দেশটির অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে মতপার্থক্যের কারণে পদত্যাগ করেন। এরপরে গুয়েভারা কিউবা থেকে নিখোঁজ হয়ে আফ্রিকা ভ্রমণ করেছিলেন এবং অবশেষে বলিভিয়ায় পুনরুত্থিত হন, যেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।

১৯২৪ সালের ১৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন আর্জেন্টাইন মার্কসবাদী, বিপ্লবী, ডাক্তার, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবায় বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব চে।
হাভানায় চে গুয়েভারা ও অ্যালেইডা মার্চের বিয়ের দিন, ১৯৫৯ সালের জুন

পারিবারিক আবহেই তিনি পেয়েছেন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পেয়েছেন তিন হাজারেরও বেশি বই। বই ভীষণ ভালোবাসতেন চে, ভালোবাসতেন কবিতা।বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী, লুটেরা, ধনিক শ্রেণীর আতঙ্ক আর মেহনতি, শ্রমজীবী, সংগ্রামী মানুষের বন্ধু চে’র ছিল বর্ণাঢ্য জীবন। তিনি তার সেই জীবনের কিছু অংশ ‘মোটরসাইকেল ডায়েরি’, ‘বলিভিয়ার ডায়েরি’ ও ‘ডাক দিয়ে যাই’ নামক তিনটি গ্রন্থে লিখে গেছেন।

চে গুয়েভারা ১৯৪৮ সালে বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি বিষয়ে লেখাপড়ার জন্য ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে লেখাপড়ায় এক বছর বিরতি দিয়ে আলবার্টো গ্রানাডো নামক এক বন্ধুকে সাথে করে মোটর সাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের চরম দারিদ্রতা দেখে ভীষণভাবে মর্মাহত হন। ভ্রমণকালে তার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হলো পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ। আর এর একমাত্র সমাধান হিসেবে তিনি দেখেন সমাজতন্ত্রিক বিপ্লব।

রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়েতামালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পঞ্চাশের দশকে ফিদেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কবিতা আর বিপ্লব চিরসঙ্গী হয়ে ওঠে। কিউবায় স্বৈরাচারী বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে টানা আড়াই বছর গেরিলা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিপ্লব সফল করেন। কিউবার মুক্তি সংগ্রামে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তিনি দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। নতুন সরকারের একাধিক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন চে। এর মধ্যে ছিল বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিল্পমন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, সামরিক বাহিনীর ইন্টারন্যাশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন ও কিউবার সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বভ্রমণ।

১৯৬৫ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি তার সেকেন্ড কমান্ড ভিক্টর বার্ক এবং ১২ জন সহচরী নিয়ে কঙ্গোয় পৌঁছান। তার কিছু দিনের মধ্যে প্রায় ১০০ জন আফ্রো-কিউবান তাদের সাথে যোগ দেন। এখানে তিনি কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে অংশ নেয়া লুমুম্বা ব্যাটেলিয়ন সংগঠনের দায়িত্ব নেন।

১৯৬৬ সালের শেষের দিকে বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে কথা বলেই কিউবার কয়েকজন কমরেডকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে বলিভিয়ায় আসেন চে গুয়েভারা। বলিভিয়ায় মার্কিন মদদপুষ্ট স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করে শ্রমজীবী, নিপীড়িত মানুষের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নেন চে গুয়েভারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কিছু অসহযোগিতার কারণে সফল হননি। ১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর মার্কিন মদদপুষ্ট বলিভিয়ার বাহিনীর হাতে কিছু গেরিলা যোদ্ধাসহ ধরা পড়েন এবং নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *