গ্যাস সংকটে ১৩ বছরেও চালু হয়নি ৪৪ শিল্প-কারখানা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি :

দীর্ঘ ১৩ বছর আগে নেত্রকোনার বিসিক শিল্পনগরীতে নির্মিত ৭০ শিল্প-কারখানার মধ্যে ৪৪টি কারখানা আজও চালু করা সম্ভব হয়নি গ্যাস সরবরাহ না থাকায়। ফলে অব্যবহৃত অবস্থায়ই নষ্ট হচ্ছে দামি যন্ত্রপাতি। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হাত গুটিয়ে বসে আছেন শিল্প-উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলা সদরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় ২০০৫-২০০৭ অর্থবছরে ছয় কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর ৭০টি প্রস্তাবিত শিল্প-প্রকল্পের জন্য ১০৩টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরে মাত্র ২৬টি শিল্প-প্রকল্প চালু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছয়টি খাদ্য ও খাদ্যজাত, দুইটি কেমিক্যাল, একটি বিকল্প জ্বালানি, একটি জুতা, দুইটি গার্মেন্টস, তিনটি পশুখাদ্য ও ওষুধ, একটি মশার কয়েল, তিনটি আয়রন ও অ্যালুমিনিয়াম, তিনটি প্লাস্টিক ক্যান, একটি মশলা, একটি খনিজ পানি উৎপাদন এবং দুইটি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা।

বাকি ৪৪টি বড় ধরনের শিল্প-প্রকল্প গ্যাসনির্ভর হওয়ায় আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। চালু না হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে বস্ত্র ও বস্ত্রজাত, প্রকৌশল, কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস্, প্লাস্টিক রাবার অ্যান্ড নন মেটাল, ইট তৈরি, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত প্রভৃতি কারখানা রয়েছে।

বিসিকের জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ৭০ জন শিল্প-উদ্যোক্তা এ পর্যন্ত ৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এদের মধ্যে যে ২৬ জন প্রকল্প চালু করেছেন। তারা গত এক বছরে (২০২৯-২০) ২৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন। আর সরকার সেখান থেকে রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয়েছে এক কোটি ২৯ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেন, বড় শিল্প-কারখানা চালু হলে বিক্রয়মূল্য এবং রাজস্ব আদায় অন্তত দশগুণ বাড়বে। বর্তমানে শিল্পনগরীর ২৬টি কারখানায় ৬শ ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। বাকি ৪৪টি বড় কারখানা চালু হলে সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

সরজমিনে দেখা গেছে, চালু হওয়া ২৬টির মধ্যেও বেশকিছু কারখানা জ্বালানিনির্ভর। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তারা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। যা পণ্যের বিক্রয় মূল্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

‘প্রিয়া ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ’র স্বত্ত্বাধিকারী তপন পাল বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় আমরা জ্বালানি হিসেবে কাঠের ভূষি ব্যবহার করছি। ভূষির দাম বেশি। পাশাপাশি ভূষি সংগ্রহ এবং রোদে শুকানো বাবদ পাঁচ-ছয়জন বাড়তি শ্রমিক খাটাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতার বাজারে উৎপাদিত পণ্য বেচতে গিয়ে চাহিদানুরূপ লাভ হচ্ছে না। গ্যাস চালু হলে উৎপাদন খরচ অনেক কম হবে।

‘মেসার্স এএল আকন্দ ফ্যাশন’ নামে একটি গার্মেন্টস কারখানার মালিক জহিরুল হাসান আকন্দ বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ না থাকায় আমরা ওয়াশিং সিস্টেম চালু করতে পারিনি। প্যান্ট, গেঞ্জি ইত্যাদি তৈরির পর গাজীপুরে পাঠিয়ে ওয়াশ করতে হয়। এতে পরিবহন ও ওয়াশিং বাবদ বাড়তি খরচ গুনতে হয়। অপচয় হয় সময়েরও।’

ব্যাংক থেকে বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে ‘মাহিতাজ আয়রন ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে একটি কারখানা চালু করেছিলেন আজিজুল হক তালুকদার। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তিনি জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি ব্যবহার করতেন। কিন্তু লাভের মুখ দেখতে পারেননি। নিরুপায়ে একবছর যাবত কারখানা বন্ধ রেখেছেন।

একই কারণে বন্ধ হয়ে আছে আতিকুল ইসলামের ‘বিসমিল্লাহ মুড়ি’ ও আব্দুস সালাম সেলুর ‘পোলার বেকারি’ এবং সাইদুল ইসলাম রুবেলের ‘মা ফাতেমা কয়েল ফ্যাক্টরি’।

নেত্রকোনা বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হাসান আকন্দ বলেন, ‘শুধুমাত্র গ্যাস না থাকায় ৪৪টি শিল্প-কারখানা এখনও চালু করা যায়নি। এসব প্রস্তাবিত শিল্প-কারখানার মালিকরা কোটি কোটি বিনিয়োগ করে এখন হতাশায় ভুগছেন। উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। অনেকে ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে দিতে ফতুর হয়ে যাচ্ছেন। কারও কারও কারখানার যন্ত্রপাতি অচলাবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে আমরা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এলাকার মন্ত্রী, এমপি, জেলা প্রশাসন ও বিসিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু আজও কোনো ফল পাইনি।’

এদিকে শিল্পনগরীতে জলাবদ্ধতা, অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ সাব-স্টেশন না থাকা, জলাধার এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের অভাবসহ আরও কিছু সমস্যার জরুরি নিরসন দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিসিকের জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক আক্রাম হোসেন বলেন, ‘বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার সময় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীতে সেটির প্রয়োজন দেখা দিলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি শিল্পনগরীর সাবস্টেশন পর্যন্ত গ্যাস লাইন স্থাপনের জন্য ৯ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকার প্রাক্কলন তৈরি করে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রস্তাবিত প্রাক্কলনটি পেট্রোবাংলার পরিচালকের (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) কাছে দাখিল করেন। পরে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠান। কিন্তু এরপর আর ফাইলটি এগোয়নি। ফলে অদ্যাবধি প্রাক্কলনের অর্থ বরাদ্দ হয়নি।

বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি জহির ফারুক বলেন, ‘শিল্পনগরীর সবগুলো কারখানা চালু করতে প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫৬ হাজার ৩২৫ ঘনফুট গ্যাস দরকার। গ্যাস সরবরাহের জন্য সর্বশেষ গত ৩০ আগস্টও কারখানার মালিকদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি আবেদন করেছি।’

জেলা প্রশাসক কাজি মো. আব্দুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্পনগরীর অনেক কল-কারখানা চালু করা যাচ্ছে না, এটা সত্য। বিষয়টির দ্রুত সমাধানের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়, খনিজ সম্পদ বিভাগসহ বিসিক ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *