টাকা দিলেই বাড়ি বাড়িপৌঁছে যাচ্ছে গ্যাস সংযোগ!

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :

সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকলেও একটি চক্রের যোগসাজশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে গ্যাস সংযোগ। টাকা দিলে মুহূর্তের মধ্যেই মিলছে সংযোগ। শুধু তাই নয়, এসব সংযোগ দেওয়ার পর গ্রাহককে বিল বহি-সহ ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রশিদের কপিও সরবরাহ করছেন সংযোগকারীরা। গ্রাহকদের কাছে এত কিছু প্রমাণাদি থাকার পরও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এর শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলছেন এসব লাইন অবৈধ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কালিসিমা, পয়াগ নরসিংহসার, রাজঘর, সুহিলপুর, উলচাপাড়া, থলিয়ারা, বাকাইল, বুধল নন্দনপুর ও রামরাইল এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে একাধিক গ্যাস ঠিকাদার জরিত। তারা গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি গ্যাস সংযোগের জন্য ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন গ্রাহকদের কাছ থেকে।

সদর উপজেলার রামরাইল নোয়াজী পাড়া এলাকার আবাসিক গ্রাহক নূরে আলম জানান, স্থানীয় গ্যাস ঠিকাদারদের মাধ্যমে তারা প্রতিটি সংযোগ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে পেয়েছেন। কিন্তু প্রায়শই ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে এসব লাইন অপসারণ করছেন। পরে সপ্তাহ দুইয়েকের ব্যবধানে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অসাধু কর্মকর্তারা তাদের লোকজন নিয়ে রাতের আধারে ঠিকাদারদের মাধ্যমে আবারও গ্রাহকের কাছ থেকে দ্বিতীয় দফায় মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর পুনরায় সংযোগ দেওয়ার ঘটনায় গ্রাহকরা পড়েছেন বিপাকে। এতে ক্ষোভের যেন শেষ নেই তাদের।

গ্রাহক নূরে আলম বলেন, ‘অন্য কেউ এসে লাইন দিচ্ছেন না। এরাই লাইন দিচ্ছেন, আবার এরাই লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন। আমরা কিছুই বলতে পারি না। প্রতি লাইনের জন্য আমাদের কাছে থেকে ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কারও কাছ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। আমরা গ্রামবাসীরা অসহায়, কিছুদিন পর পর লাইন উঠিয়ে নেন, আবার পরে এসে লাগিয়ে দেন। এ জেন এক ধরনের নাটক।’

প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে লাইন অপসারণ করছেনআরেক গ্রাহক তানবীর ভূঁইয়া তুষার বলেন, ‘৭০ হাজার টাকা নিয়ে বলেছে বৈধ লাইন আসছে। এখন আমাদের (ডিমান্ড নোট) বিল বই রশিদ সবই আছে। কিন্তু লাইন নাকি অবৈধ! আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। পাশাপাশি যারা বৈধ লাইন বলে অবৈধ লাইন স্থাপন করছেন, তাদের গ্রেফতারসহ বিচার চাই।’

ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গ্যাস গ্রাহক দুলাল মিয়া বলেন, ‘একবার লাগিয়ে দেন, দুই মাস পর এসে লাইন কেটে দেন। এটা ব্যবসা হয়ে গেছে তাদের। কেউ কেউ এক লাখ টাকাও দিয়েছেন লাইনের জন্য। কেউ ভিটা বিক্রি করেও টাকা দিয়েছেন সুখে থাকার জন্য। আমাদের হয়রানি করছেন তারা। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পরও সঠিক লাইন দিচ্ছেন না।’

এদিকে, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়েন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম জাহিদুর রেজা। গ্রাহকেরা তাকে জিজ্ঞেস করেন, গ্যাসের লাইন অবৈধ হলে বিল বই কারা দিয়েছেন? গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সময় যারা আসেন তারা সবাই বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির লোকজন বলে অভিযোগ করেন গ্রাহকরা।

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ডিজিএম জাহিদুর রেজা জানান, সরকার ২০১৬ সালে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারিভাবে আবাসিক সংযোগ দেওয়ার জন্যে নতুন ঘোষণা না আসে, ততক্ষণ গ্রাহকেরা নতুন সংযোগ পাবেন না। এছাড়া আপনারা যেসব লাইন নিয়েছেন সব অবৈধ। তিনি আরও বলেন, ‘কম্পিউটারে ডাটাবেচ-এ অন্তভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই লাইনকে অফিসিয়ালভাবে বৈধ লাইন বলতে পারি না। এসব লাইনকে অবৈধ লাইন বলি।’

তবে রাতের আঁধারে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘রাতের আঁধারে কে বা কারা এই কাজ করেন, আমরা জানি না।’ এ সময় তিনি সাংবাদিকদের তাকে অবৈধ সংযোগ সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার কথা বলেন। যদি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কেউ জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজকুমার বিশ্বাস জানান, গ্যাস সংযোগ বিছিন্ন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার দায়িত্ব পালন করে থাকেন তারা। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কোনও ধরনের আইনগত সহযোগিতা নিতে চাইলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ ধাপে ১১ হাজার ফুট গ্যাস লাইন অপসারণ এবং ৪শ’ আবাসিক গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। আর গত দুই বছরের ব্যবধানে মোট ৯০ হাজার ফুট অবৈধ গ্যাসলাইন অপসারণ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *