নীলচে তারার রাত

অনীলা পারভীন :

সন্ধ্যাতারাটা কি আজ একটু বেশি উজ্জ্বল? তারার নীলচে রঙটাও চোখে পড়ার মতো। আকাশও আগের চেয়ে অনেক ঝকঝকে। বাতাসে ধোঁয়াটে ভাবটা খুবই কম। ক’দিন ধরে সকালে পাখির কিচিরমিচিরে ঘুমানো দায়। পাখিগুলি কোথায় ছিলো এতদিন? এই দুর্যোগের সময়ে, চারদিকে মানুষের মৃত্যুর মিছিল। প্রকৃতির মাঝে এত প্রাণ-চঞ্চলতা কেন? নাহ, ক’দিনের জ্বরে মনে হয় আমারও মাথা ঠিক নেই। রাত দুপুরে হঠাৎ করেই খুশখুশে কাশিটা বেড়ে গেল। বুকের মধ্যে চাপাব্যথা। জ্বরটাও যাচ্ছে না। কাশি দিলে বুকের মধ্যে কেমন জানি অদ্ভুত শব্দ হয়! যা আগে কখনো শুনিনি। কাশির শব্দে নিজের অজান্তেই চমকে উঠি। এমনিতেই বাসায় একা থাকি। রাত হলে গা ছমছম করে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে মনে হয়, মাথার কাছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। না হয়, খাটের নিচে কেউ ঘাপটি মেরে আছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ঘরের বাতি জ্বেলে ঘুমাই। কিন্তু আলোতে যে আমার ঘুম আসে না। তার ওপর চারদিকে কোয়ারেন্টাইন চলছে। কেউ কারো বাসা থেকে বের হয় না। নিস্তব্ধতা, নিঃসঙ্গতা যেন গিলে ফেলছে সব। শহরটি ধীরে ধীরে ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হচ্ছে। হঠাৎ শুনতে পেলাম, ঘরের ভেতর কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে, ভয়ে হাত পা হিম হয়ে যাচ্ছে। অনেক সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,

—কে? কে কথা বলে?

অনেকগুলি কিন্নর কণ্ঠ একসঙ্গে বলে ওঠে,

—এই তো আমরা।

কিছুক্ষণের জন্য কথা বলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেললাম। মনে মনে বলার চেষ্টা করলাম, যা শুনেছি সব ভুল, সব কল্পনা। নিজের অজান্তেই আবার জিজ্ঞেস করে ফেললাম,

—তোমরা কারা?

—আমরা তোমার সঙ্গেই তো আছি ক’দিন ধরে।

মানে কী? আমার সাথে মানে কী? আমি তো বাসায় একা থাকি। কোয়ারেন্টাইনের কারণে বাসা থেকে সহজে বেরও হই না। কেউ বাসায় আসেও না। কী সব উল্টো-পাল্টা শুনছি! নিজের ওপর একটু বিরক্তি নিয়েই বললাম,

—এই! কে তোমরা? কী চাও এত রাতে?

—আরে, আমাদের চিনতে পারছো না?

অনেকগুলি কণ্ঠ একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠে। কী যন্ত্রণা! এরা আমার ঘরে কীভাবে এলো? আলো জ্বালিয়ে যে দেখব, সেই সাহসও পাচ্ছি না। কী না কী দেখতে হয়, ঠিক আছে?

—তোমরা কখন, কীভাবে আমার বাসায় ঢুকলে?

—কেন ভুলে গেছ, কয়েকদিন আগে বিকেলবেলা হাঁটতে বের হয়েছিলে, পথে যাকে পেলে তাকেই আগ বাড়িয়ে বাসা থেকে বের না হবার পরামর্শ দিলে। হাওয়া খেতে পার্কে একটু বসলে। ফেরার পথে একটু বাজারও করলে।

—হায়! হায়! এসব বলে কী? আমি তো কিছুই টের পেলাম না।

—আরে তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? আমরা তো তোমাদের উপকার করতেই এসেছি।

—উপকার! কীভাবে?

—উপকার নয়? তোমরা মানবজাতি এই পৃথিবীটার কী হাল করেছ! না পরিবেশ রক্ষা করতেপারছ, না নিজেরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছ। সব তোমাদের আয়ত্ত্বের বাইরে চলে গেছে। অথচ দেখো আমরা এসে তোমাদেরকে কেমন সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছি। এখন প্রকৃতি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তোমরাও যার যার ঘরে ভদ্রভাবে বসে আছ। যানজট, শব্দ, কোলাহল, ধোঁয়া সবকিছু থেকে এখন পৃথিবী মুক্ত। প্রশান্তির ছোঁয়া সমস্ত প্রকৃতি জুড়ে। তাই না?

—কী বলছো তোমরা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

—এখনও বোঝোনি? এই পৃথিবীর কল্যাণেই তো আমরা নিয়োজিত, যাদেরকে তোমরা নাম দিয়েছ ‘করোনা’।

—করোনা!

—কী বলছ এসব? তোমরা তো মানুষ মেরে ফেলছো।

—কিছু পেতে হলে তো কিছু হারাতেই হয়। তাই তোমাদেরকেও কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হবে। কথা আর না বাড়িয়ে এবার আমাদের কাজটা সেরে ফেলি।

—আবার কী কাজ তোমাদের?

—আরে, তোমাকে তো দেখি সব ভেঙ্গে বলতে হয়। এবার তো তোমার পালা।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই কদমফুলের মত শত শত করোনা জ্বলে উঠে আমার দিকে ধেয়ে আসে। তীব্র যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠি। ধীরে ধীরে চারদিক গাঢ়, ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *