করোনাকালে খাদ্য নিরাপত্তা জরুরি

অলোক আচার্য :

পৃথিবী আক্রান্ত করোনাসৃষ্ট মহামারিতে। যুক্তরাষ্ট্রে এ কারণে মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্তের হার কমেছে। প্রথম দিকে সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউনের পথে হেঁটেছে। বন্ধ ছিল সবকিছু। স্থবির হয়ে পড়েছিল অর্থনীতির চাকা। পরবর্তী সময়ে জীবিকার প্রয়োজনে স্থবির অর্থনীতি সচল করার জন্য সবকিছু খুলে দেওয়া হয়। কারণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনে দুর্ভোগ চরমে উঠেছিল। তারপর থেকেই এভাবে চলছে।

মানুষ নিউ নর্মাল লাইফ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এখন ভরসার কথা এই, করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ চলছে পুরোদমে। বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুতই তা কার্যকরভাবে সবার জন্য প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেটা কতদিনে সম্ভব নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে করোনাভাইরাসের কার্যকর টিকা সহজলভ্য হওয়ার আগেই বিশ্বব্যাপী এ ভাইরাসে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের এই অতিমারির মধ্যেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সন্নিকটে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরোপের কয়েকটি দেশে সংক্রমণের হার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে সেসব এলাকায় কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শীতকালে সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যদিও এখন নতুন করে লকডাউনের পথে অনেক দেশই হয়তো আর হাঁটবে না। অর্থনীতি বাঁচাতে শিল্প কলকারখানা চালু রাখতেই হবে। করোনাভাইরাসের কারণে প্রাণের পরেই যে ক্ষতি বেশি তা হলো অর্থনীতি। এর পাশাপাশি খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিও বিশ্বে তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিভিন্ন দেশে টেকসই খাদ্য নীতি গ্রহণ করা জরুরি। স্বনির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখা আবশ্যক। যাতে প্রয়োজনের সময় আভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়।

পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বা খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে তার আভাসও কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফও) এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বিশ্বের ২৭ কোটি মানুষ খাদ্য সংকটের মুখে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এভাবে চললে এই বছর শেষেই ১৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে পড়বেন। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের খাদ্য বিভাগের প্রধান ধনকুবেরদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন। তার কথায় দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের অভাবে মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ৩ কোটি মানুষকে বাঁচাতে বছরে অন্তত ৪৯০ কোটি ডলার সাহায্য প্রয়োজন। ডব্লিউএফপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কঙ্গোতে ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করছে প্রায় দেড় কোটি মানুষ। নাইজেরিয়ায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ খাদ্য অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

পৃথিবীতে দুই ধরনের চিত্র চোখে পড়ে। এক শ্রেণির মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে এবং এর একটা অংশ নষ্ট হচ্ছে। বিপরীতে অন্য শ্রেণি দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। কেবল করোনা অতিমারিরর কারণেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চলা যুদ্ধ বা হানাহানির কারণেও সেখানকার মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে। অর্থাৎ খাদ্য সংকট অস্থিতিশীল বিশ্বের একটি চিত্র। সম্পদের অসম বন্টনের একটি কারণ। খাদ্য সংকট মোকাবিলায় টেকসই কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহে রাখা এবং তা বন্টন নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই সুসংহত অবস্থানে রয়েছে। এক সময় আমরা খাদ্য ঘাটতিতে ছিলাম। এখন তা নেই। আমরা খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ। আশার কথা, এই করোনাভাইরাস অতিমারির কালেও বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে। আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনে একধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় ধান উৎপাদনকারী দেশ।

করোনা বিপর্যয়ের মধ্যেই সর্বোচ্চ খাদ্য উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে স্বস্তিতে দেশ। এটা আমাদের জন্যও আনন্দের। বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকিতে সেখানে আমাদের দেশের খাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ধান উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে থাকলেও করোনাকালে ফলন ভালো হওয়ায় তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এই অবস্থানে আগে ছিল ইন্দোনেশিয়া। ধান উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে চীন এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষি বিভাগ ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে এই সুসংবাদ দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন চাল রপ্তানিকারক দেশ।

খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। কারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার প্রথমেই হলো খাদ্য। তারপর অন্যসব চাহিদা পূরণের কথা আসে। একবেলা যে প্রতিদিন অনাহারে থাকে সেই বোঝে খাদ্যের অভাব। তাই সবার আগে সবার জন্য খাদ্য। এটা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশের চিত্র হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে। এ সময় খাদ্য নিরাপত্তা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি ছিল এবং সে লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি আমরা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রেকর্ড পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদিত হয়েছে যার পরিমাণ সর্বোচ্চ দুই কোটি দুই লাখ টন। আমন উৎপাদিত হয়েছে এক কোটি ৫৩ লাখ টন। এই অর্জন একদিনের নয়। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা এবং কৃষির উন্নয়নের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ শুরু হয়েছে এবং তা চলমান। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কারণে কৃষিতে সাফল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকের দুর্ভোগ লাঘব হচ্ছে। তবে এই সুবিধা আরও পর্যাপ্ত করতে হবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় খাদ্য সরবরাহ চক্রে ইতোমধ্যেই চাপ পড়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপের শুরুতে যখন দেশে দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছিল তখন এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বন্ধ থাকে সব রকম আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। এক দেশ তার খাদ্য ঘাটতি থাকলে তা আমদানির মাধ্যমে মেটায়। সেই সুযোগ না থাকলে নির্ভর করতে হয় নিজ দেশে খাদ্য মজুদের ওপর। আর নিজ দেশে উৎপাদন পর্যাপ্ত না হলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। যেহেতু আমাদের পর্যাপ্ত উৎপাদন হয়েছে এবং খাদ্য মজুদ রয়েছে ফলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বাজারে অকারণে দাম বৃদ্ধি না ঘটে এবং ক্রেতার ওপর চাপ না পড়ে। কারণ করোনার কারণে মানুষের আর্থিক ক্ষতি সারিয়ে উঠতে আরও সময় লাগবে। এখন বাজারে চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই এই মূল্য বৃদ্ধি ঘটছে। যা ক্রেতাদের জীবন যাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত থাকার পাশাপাশি খাদ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *