দেখব এবার জগৎটাকে


আবু জাফর সাইফুদ্দিন :

‘ভ্রমণ’ হচ্ছে মানুষের তুলনামুলকভাবে দূরতম ভৌগোলিক স্থানের মধ্যে গতিবিধি বা চলন। ভ্রমণ পিপাসুরা সাধারণত পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, গাড়িতে, ট্রেনে, নৌকায় কিংবা প্লেনে ভ্রমণে যায়। আদিম মানুষের মধ্যেই ছিল যাযাবর বৃত্তি। আজও মানুষ ভ্রমণ করতে ভালোবাসে। কবি নজরুল লিখেছেন, থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা.. অথবা, বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু..।
উইকিপিডিয়া সূত্র মতে, ভ্রমণ বা ট্রাভেল শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে আদি ফরাসি শব্দ ঃৎধাধরষ থেকে। মেরিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুসারে যতদূর জানা যায় ভ্রমণ শব্দটার ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে। সেখানে এটাও বলা আছে যে ভ্রমণ শব্দটা প্রথমে আদি ফরাসি শব্দ ঃৎধাধরষষবৎ (যার মানে পরিশ্রমের সাথে কাজ করা) হয়ে পরবর্তীতে ইংরেজি শব্দ ঃৎধাধরষবহ, ঃৎধাবষবহ এর মধ্য দিয়ে উৎপত্তি লাভ করেছে। ইংরেজিতে এখনও মাঝেমাঝে ঃৎধাধরষ এবং ঃৎধাধরষং শব্দ দুটো ব্যবহার করা হয়।
ভ্রমণের বিভিন্ন কারণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে চিত্তবিনোদন, পর্যটন এবং অবকাশ যাপন, তথ্য জড়ো করার জন্য ভ্রমণ গবেষণা, ছুটি কাটানোর জন্য ভ্রমণ, দাতব্যের জন্য স্বেচ্ছাসেবক ভ্রমণ, অভিবাসনের দ্বারা অন্য কোথাও বসবাস শুরু করা, ধর্মীয় তীর্থযাত্রা, কোনো মিশনে যাত্রা, ব্যাবসায়িক ভ্রমণ,বাণিজ্য, বিনিময়, এবং অন্যান্য কারণে, যেমন চিকিৎসা অথবা যুদ্ধগ্রস্ত জায়গা থেকে আভিবাসী হওয়া অথবা ভ্রমণ উপভোগ করার জন্যে।
ভ্রমণকে কেন্দ্র করে আজ দেশে দেশে পড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প। অনেক দেশে পর্যটন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় ও বিদেশি মুদ্রা উপার্জনের একটি কার্যকর শিল্পখাত। যার মধ্য দিয়ে বিশ্বে পর্যটন শিল্প একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সুপরিচিত। বাংলাদেশ এলাকায় এর সূত্রপাত ঘটে ১৯৬০-এর দশকে। বিদেশ থেকে পর্যটকরা এখানে আসতেন সমুদ্র সৈকতের আকর্ষণে, এদেশের শ্যামলসবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পূর্ববাংলার নদ-নদী, বনভূমি, পাহাড়ি অঞ্চল, ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থান, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক জীবন সবই পর্যটকদের আকৃষ্ট করে থাকে। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় গড়ে ওঠা পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চল রয়েছে। এ দেশের প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য দেশ থেকে অনন্য ও একক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলে মনে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আধুনিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভ্রমণের রয়েছে অনেক কার্যকারিতা। যার মধ্যে রয়েছে-
১. ভ্রমণ আমাদের বুদ্ধির তীক্ষ্নতা বাড়ায় : খোলামেলা পরিবেশ আমাদের বুদ্ধির তীক্ষ্নতা অনেক গুন বাড়িয়ে দেয় যা চার দেওয়ালের আবদ্ধ পরিবেশে সম্ভব নয়। ঊহারৎড়হসবহঃধষ চংুপযড়ষড়মু জবংবধৎপযবৎং এর রিপোর্ট অনুযায়ী একজন মানুষ যে মাত্র ৪০ সেকেন্ডের জন্য একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে সে তার পরবর্তী কাজে ভালো ফল করে। ২. ভ্রমণ মানবিকতা ও উদারতা বাড়ায় : বিভিন্ন্ মানুষ ও বিভিন্ন আর্থ সামাজিক পরিবেশ এবং অন্যের সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে মানুষের উদার মানসিকতা তৈরী হয়। “নানা জাতি নানা মত নানা পরিধান” এর সঙ্গে পরিচিতি ঘটলে মানবিকতা বোধ গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ভ্রমণ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাদের মধ্যে অন্য ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে।
৩. ভ্রমণ শিক্ষায় আগ্রহী করে : যে কোনো নতুনত্ত্ব মানুষের কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়। আর এই কৌতুহল বা ঔৎসুক্যই শেখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। আর নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ তাই মানুষকে প্রকৃতপক্ষ্যে শিক্ষায় উৎসাহী করে তোলে।
৪. ভ্রমণ সৃজনশীলতা বাড়ায় : মানুষের মনের ভেতরে থাকা সৃজনশীলতাকে উস্কে দেয় ভ্রমণ। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করে থাকে। তা দেখে ভেতরের শিল্পী মনে চাপ পড়ায় নতুন সৃষ্টির বাসনা জেগে ওঠে।
৫. ভ্রমণ জীবনবোধ তৈরী করে : অজানা অচেনা পরিবেশে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। ফলে গন্ডীবদ্ধ জীবনে নিজের জীবনের অবস্থান সুস্পষ্ঠ হয়না। তাই দেখাযায় ভ্রমণের ফলে আত্ম-জীবন, বিশ্ব-জীবন উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরী হয়। তাই বলা হয় ভ্রমণ মানুষের জীবনবোধ জাগ্রত করে।
৬. ভ্রমণ মানুষকে খুশি রাখে : প্রতিটি মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অনুসন্ধিৎসু শিশু সত্তা। নতুনের আনন্দ মানুষের স্বভাবের অঙ্গ। তাই দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের মাধ্যমে বিমর্ষ ভাব কেটে যায় আর মন খুশিতে ভরে ওঠে।
৭. ভ্রমণ মানুষের ধৈর্য বাড়ায় : অজানা অচেনা পরিবেশে নিজের প্রয়োজনের উপাদান জোগাড় করতে অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। সেখানে নিজের বাড়ির মতন রাগ দেখানোর উপায় থাকে না। খুব সত্যি কথা ইটা যে ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষের ধৈর্য শক্তি বেড়ে যায়।
৮. ভ্রমণ সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে : নানা দেশে নানা ভাষার ভিড়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। চরম লাজুকও সেখানে বাঙময় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষা, পেশা, সামাজিক অবস্থানের মানুষের সঙ্গে পরিচিতি হবার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক দক্ষতা বেড়ে উঠতে থাকে। এমনকি যাত্রাকালে সহযাত্রীদের মধ্যেও সদ্ভাব গড়ে ওঠে।
৯. ভ্রমণ মানসিক চাপ কমায় : আগে মানুষের অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তার “চেঞ্জে” যাবার বিধান দিতেন। এর মূল কারন হলো মানসিক প্রশান্তির প্রয়োজনীয়তা। মন খুশি হবার সাথে সাথে প্রতিদিনের জীবনের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায় ভ্রমণের সাথে সাথে।
আসুন আরও জেনে নেই ভ্রমণে কী কী উপকারিতা আছে-
মানসিক চাপ কমানো : ভ্রমণ মানসিক চাপ কমানো এবং নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ভালো উপায়। ছুটির সময়টা বাড়ির বাইরে গিয়ে কাটান। দেখবেন আপনি দৈনন্দিন ঝামেলা থেকে দূরে থাকবেন। ছুটি শেষে যখন ঘরে ফিরবেন; তখন একটা সতেজ বোধ এবং অনুপ্রেরণা কাজ করবে।
সামাজিক দক্ষতা : ভ্রমণে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়। আপনার পাশে বসা মানুষটির সঙ্গে আলাপ হতে পারে। এতে আপনার সামাজিক দক্ষতা বাড়বে। অনেকেই আবার নতুন পরিবেশে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। এমন সমস্যায় ভ্রমণ হতে পারে ভালো সমাধান।
ধৈর্যশীলতা : ঘোরাঘুরি করতে গেলে আপনাকে আরো বেশি ধৈর্যশীল হতে হবে। চাওয়ামাত্রই সব হয়তো হাতের কাছে চলে আসবে না। কেননা বের হলেই দেখবেন, কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। খাবারের জন্য রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি আপনাকে সামাল দিতে হবে।
ইতিবাচক চিন্তা : ভ্রমণ আপনাকে লক্ষ্য অর্জনেও সাহায্য করবে। ভ্রমণ করলে আপনি কিছুটা ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হবেন। মনে করুন, পাহাড়ে ওঠার লক্ষ্য অর্জন করলে আপনি হয়তো আবার একটি লক্ষ্য ঠিক করে নিবেন। এভাবে লক্ষ্য অর্জন আপনাকে দিতে পারে আত্মবিশ্বাস এবং সফলতা।
মানসিকতা : বেড়াতে গেলে মানসিকতা বাড়ে। খারাপ আবহাওয়ায় তারিখ পরিবর্তন হতে পারে। তখন নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসবই আপনাকে অনেক নমনীয় করে তুলবে। আরো বেশি মুক্তমন তৈরি করে দেবে। এসবই আপনার দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগবে।
শত ব্যস্ততার মাঝেও কার না ভালো লাগে একটু ঘুরে বেড়াতে। তাই জীবনের কিছুটা অংশ থাক না রাখা ভ্রমনের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *