স্থূলতা একটি নীরব ঘাতক

সিয়াম আহমেদ :

ইংরেজি ওবেসিটি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে স্থূলতা। স্থূলতা বলতে শরীরের এমন একটি বিশেষ অবস্থাকে বুঝায় যখন শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি জমে যায়।

বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি জীবনের শক্তি বা ক্যালোরির প্রয়োজন হয়। আর এই ক্যালোরি আসে আমাদের দৈনন্দিন গৃহীত খাবার থেকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ক্যালোরি খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। মানুষ যখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করে তখন তা শরীরে চর্বি হিসেবে অব্যবহূত থেকে যায়। দীর্ঘদিন এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে শরীরে মেদ জমে যায়। ফলে শরীরের ওজন বেড়ে যায় এবং নানারকম জটিলতা দেখা দেয়।

সাধারণত স্থূলতা মাপার জন্য ‘বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই’ ব্যবহার করা হয়। কোনো ব্যক্তির ওজনকে কেজিতে এবং উচ্চতাকে মিটারে নিয়ে উচ্চতার বর্গ দ্বারা ওজনকে ভাগ করলেই ঐ ব্যক্তির বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই পাওয়া যায়। কারো বিএমআই ১৮.৫ এর নিচে হলে তাকে আন্ডারওয়েট বা কম ওজন বলা হয়। আর ১৮.৫-২৪.৯ বিএমআইকে স্বাভাবিক ওজন বলা হয়। অন্য দিকে ২৫.০-২৯.৯ বিএমআইকে ওভারওয়েট বা অতিরিক্ত ওজন এবং ৩০.০ বা তার চেয়ে বেশি বিএমআইকে অতি স্থূলকায় বা অতিরিক্ত মোটা বলা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, গত দুই দশকে বিশ্বে স্থূলতা বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন। স্থূলতা এখন কোনো নিছক স্বাস্থ্য সমস্যা নয় বরং এটি একটি রোগ। আর প্রতি বছর অন্তত ৩০ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে ভুগে মারা যায়। তাই অনেক বিশ্লেষকই এটিকে ক্যানসার-এইডসের মতো বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি রূপে দেখছেন।

স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার কারণসমূহ:

১। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালোরিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, ২। অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার ও ফাস্টফুড খাওয়ার অভ্যাস, ৩। বংশগত কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, জেনেটিক বা বংশগত কারণে স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। যদি বাবা অথবা মায়ের যে কোনো একজনের স্থূলতা থাকে, তাহলে সম্ভাবনা ৪০% এবং যদি উভয়ের স্থূলতা থাকে, তাহলে সম্ভাবনা ৮০%। ৪। অ্যালকোহল, ৫। আয়েশি জীবনযাপন ইত্যাদি। তাছাড়া এন্টিডিপ্রেশন ও কর্টিকস্টোরয়েড জাতীয় কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও স্থূলতা দেখা দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় উন্নত দেশগুলোতে স্থূলতার হার অনেক বেশি। অপর দিকে গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষেরা স্থূলতায় ভুগেন। আবার পুরুষের তুলনায় নারীর স্থূলতার হার তুলনামূলক বেশি। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও প্রযুক্তির প্রতি অতিনির্ভরশীলতাকে স্থূলতার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। বর্তমানে শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ এবং সুযোগ—দুটোই কমে গেছে। আমাদের দেশের শতকরা ২০ ভাগ স্কুলেও পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। শিশুরা প্রতিনিয়ত শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তারা স্থূলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

অপর দিকে অপরিকল্পিত আবাসন কাঠামো এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনও স্থূলতার জন্য দায়ী। শহরগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক পার্কের সংকট থাকায় মানুষজন প্রয়োজনীয় শরীর চর্চার সুযোগ পাচ্ছে না। তাছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই গৃহিণী। দিনের অধিকাংশ সময় তারা শুয়ে-বসে বা টিভি দেখে কাটান। তারা খুব একটা শারীরিক পরিশ্রম করেন না বা করার সুযোগও পান না। ফলে স্থূলতায় আক্রান্ত হন।

স্থূলতা মানুষের শরীরে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি করে। যেমন, উচ্চরক্তচাপ, হূদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অথেরোসে্ক্লরোসিস,পালমুনারি ইনসাফিয়েন্সি ইত্যাদি। এছাড়া স্থূলতা মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রজননসংক্রান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে। পরিসংখ্যান বলছে, স্থূলতায় আক্রান্ত রোগীরা প্রায়শই মানসিক হীনমন্যতায় ভুগেন।

বর্তমান সময়ে স্থূলতার এই ‘মহামারি’ ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগ থেকে বাঁচতে নিয়মিত শরীরচর্চার ও পরিমিত খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ফাস্টফুড, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার, অ্যালকোহল ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে এবং ওজন নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে। যে কোনো জটিলতা দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *