পৃথিবীর বিখ্যাত ফুলের বাগান


মহাকাল ডেস্ক :
মন ভালো করার জন্য ফুলের বাগানে ভ্রমণ অত্যন্ত সুখকর একটি বিষয়। ফুল এমন একটি বস্তু যা চোখের পলকেই বিষণ্ন মনকে প্রফুল্ল করে দিতে পারে। সত্যি কথা বলতে একটি মানুষ মনের দিক দিয়ে যতই কঠোর হোক না কেন ফুল তার ভালো লাগবেই। কেননা, ফুল ভালোবাসে না এমন মানুষ এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। সকল পুষ্প অনুরাগীদের উৎসর্গ করে বিশ্বের বিখ্যাত ৫টি ফুলের বাগান নিয়ে আমাদের এই আয়োজন যা আপনার মনকে ছুঁয়ে যাবে এবং অন্তরের গহীনে রেখে যাবে এক নিবিড় ভালো লাগার আবেশ।
দুবাই মিরাকল গার্ডেন : মধ্য প্রাচ্যের ধনী দেশ দুবাই-এর কথা ভাবলেই শুধু রুক্ষ মরুভূমি আর বড় বড় ইট পাথরের ইমারতের ছবি আমাদের চোখে ভেসে উঠে। কিন্তু দুবাইতে আরো অনেক কিছুই আছে যা আমাদের দৃষ্টি ও মনকে অবাক এবং বিমোহিত করে চোখের পলকেই। এর মধ্যে একটি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ফুলের বাগান দুবাই মিরাকল গার্ডেন। ফুল দিয়ে যে কত অবাক করা আর নজরকাড়া স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব তা দুবাই মিরাকল গার্ডেন না দেখলে উপলব্ধি করা কঠিন। এটি ৭২০০০ হাজার মিটার জায়গা জুড়ে প্রায় ১০৯ মিলিয়ন ফুলের গাছে সমৃদ্ধ, যা ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারীতে যাত্রা শুরু করে।
বিভিন্ন দৃষ্টি নন্দন আকার আকৃতি ও বাহারি বর্ণের ফুল দিয়ে এই পুরো বাগান সাজানো হয়েছে। যার মধ্যে বিশেষ আকর্ষনীয় এ ৩৮০ বিমানের আদলে তৈরি করা পাঁচ লক্ষাধিক ফুলে আবৃত স্থাপনাটি। যা ২০১৬ সালের ২রা ডিসেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুল দিয়ে তৈরি স্থাপনা হিসাবে গিনেজ বুক রেকর্ডে স্থান পায়। সত্যিই অবাক করার মত এই বাগান যা একবার দেখলেই এর নামকরনের স্বার্থকতা উপলব্ধি করা যার। তাই কখনো সময় সুযোগ হলে ঘুরে আসুন দুবাই মিরাকল গার্ডেন আর এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে আপনাকে খরছ করতে হবে ৪০ দিরহাম যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯০০ টাকা। তবে ২ থেকে ১২ বছরের শিশুদের জন্য টিকিটের মূল্য ৩০ দিরহাম। অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯ টা আর ছুটির দিনে (শুক্রবার ও শনিবার) সকাল ৯ টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে সুন্দর এই বাগান। তবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর উ”চ তাপমাত্রার জন্য এটি বন্ধ থাকে কারন এই সময়ে সেখানকার আবহাওয়া মানুষের জন্য খোলা আকাশের নিচে চলাফেরা করার উপযুক্ত নয় ।
কোকেনহাফ বা কিচেন গার্ডেন : এটি গার্ডেন অব ইউরোপ নামেও পরিচিত। যা ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফুলের বাগান এবং এটি প্রায় ৭৯ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। অবাক করার মত তথ্য হলো, প্রতি বছর প্রায় ৭ মিলিয়নের মত ফুলের চারা এই বাগানে রোপন করা হয়। যা পরবর্তীতে রঙ্গিন ফুলের সৌন্দর্য্যে পর্যটকদের বিমোহিত করে রাখে। ব্যতিক্রমী বাগান সম্পর্কে ধারনা পেতে এটি হতে পারে সবচেয়ে ভালো উদাহরন। বিশেষ করে বাগানের ভিতর মেঠো পথ, জলজ বাগান, ঝর্ণা ও পুকুরের অংশ এর রুপ বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে। এই বিশাল বাগানের ফুলের রুপ উপভোগের পাশাপাশি এখানে ফুল নিয়ে কিছু প্রদর্শনী ও বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। অসংখ্য সুন্দর ফুলের মধ্যে ৭ মিলিয়ন প্রজাতির টিউলিপ, ড্যাফোডিল আর কচুরিপানা স্বদৃশ্য নীলাভ জাতের ফুলের রুপ মন পাগল করার মত। প্রতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ পর্যন্ত বাগানটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। আপনাকে এই বাগানে প্রবেশ করতে অবশ্যই টিকিট সংগ্রহ করতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক লোকের জন্য টিকিটের মূল্য ১৮ ইউরো আর শিশুদের জন্য ৮ ইউরো।
কোয়াচি ফুজি গার্ডেন : এই বাগান মন মাতানো উইস্টেরিয়া ফুলের জন্য জনপ্রিয়। ফুটন্ত উইস্টেরিয়া ফুল দেখলে মনে হয় ঠিক যেন কোন দক্ষ শিল্পির রঙ তুলির আঁচরে ফুটে উঠা কোন ছবির দৃশ্য। তবে এই বাগানের সবচেয়ে আকর্ষনীয় বিষয় হচ্ছে উইস্টেরিয়া ফুলে আবৃত দুটি টানেল, যার একটি ৮০ মিটার ও অন্যটি প্রায় ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যের। কোয়াচি ফুজি গার্ডেন মূলত ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগান, যা বসন্ত কালে সৌন্দর্য্য অবলোকন করার জন্য জন্য খুলে দেয়া হয়। ১০,০০০ বর্গ মিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত অনিন্দ্য সুন্দর উইস্টেরিয়া ফুলের বাগানটিতে প্রায় ২২ প্রজাতির ১৫০টি উইস্টেরিয়া গাছ রয়েছে। এপ্রিলের মধ্য ভাগ থেকে মে মাসের শেষের দিকে ঘুরতে গেলে আপনি এই বাগানের প্রকৃত রুপ উপভোগ করতে পারবেন। কোয়াচি ফুজি গার্ডেন সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত পরিদর্শনের জন্য খোলা থাকে। আপনি যদি ৩ দিন ব্যাপি উইস্টেরিয়া ফেস্টিভাল উপভোগ করতে চান তবে আপনাকে এপ্রিলের ২৭ থেকে ২৯ তারিখের মধ্যে বাগানটি দেখতে আসতে হবে। এই বাগানে প্রবেশ মূল্য ৫০০ থেকে ১৫০০ ইয়েন, যা ফুল ফোটার তারতম্যের সাথে হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। অর্থাৎ মূল ঋতুতে আপনাকে অবশ্যই অগ্রিম টিকিট কিনে রাখতে হবে নয়তো আপনাকে বাড়তি অর্থ গুনতে হবে।
বাটচার্ট গার্ডেন : ১৯০৪ সালে স্থাপিত বিশ্বের প্রাচীন ও সুন্দরতম ফুলের বাগানের মধ্যে বাটচার্ট গার্ডেন অন্যতম। প্রতি বছর মিলিয়নেরও বেশি দর্শনার্থীকে তার আকর্ষনে মুগ্ধ করে রাখে। দৃষ্টি নন্দন বাগানটি কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যের রাজধানী ভিক্টোরিয়ার কাছে ব্রেন্টউড বে’র ভেনকুভের দ্বীপে প্রায় ৫৫ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সমগ্র বাগানটি প্রায় ৩,০০,০০০ লাখ ফুল গাছে পরিপূর্ণ। ২০০৪ সালে বাটচার্ট গার্ডেন কানাডার একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। বসন্তকালে অসংখ্য টিউলিপ, ক্যামেলিয়া, ম্যাগনোলিইয়া, অর্নামেন্টাল চেরি আর ড্যাফোডিল ফুলের রুপে, বর্ণ এবং ঘ্রাণে আপনাকে বিমোহিত করবেন। আর গ্রীষ্মকালে গোলাপ বাগানের সৌন্দর্য ও সুঘ্রাণ, সান্ধ্যকালীন আনন্দ আয়োজন, রাতের বর্ণিল আলোকসজ্জা ও নৌকা ভ্রমণে পার করতে পারেন সুন্দর কিছু সময়। উপরন্তু বর্ষাকালে ম্যাপল গাছের পাতাগুলো সোনালী ও লাল বর্ণ ধারন করে যা অনেক মনোমুগ্ধকর। এখানে ক্রিসমাসে বিভিন্ন ব্যয়বহুল আয়োজনের সাথে আলোকসজ্জা ও বরফে স্কেটিং করার এক সুবর্ন সুযোগ পাবেন। এক কথায় বাগানের সকল কিছুই এমন সুচারু ভাবে সাজানো যা সারা বছর আপনাকে আনন্দ দেবার জন্য ডাকছে। এই বাগানের সৌন্দর্য্য উপভোগে আপনাকে ব্যয় করতে হবে ১৭০ থেকে ২০০ মার্কিন ডলার কেননা বছরের বিভিন্ন সময়ে এই মূল্যের তারতম্য হয়।
মনেট গার্ডেন : মনেট গার্ডেন ফ্রান্সের বিখ্যাত বাগানের একটি। দর্শনার্থীদের মন মাতাতে এই বাগান তার রুপ লাবণ্যে সর্বদায় এক ধাপ এগিয়ে এবং প্রতি বছর প্রায় ৫,০০,০০০ লাখ লোক এখানে ঘুরতে আসে। সুন্দর মনেট গার্ডেনটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত, যার একটি অংশ ক্লস নরম্যান্ড নামে ও অন্য অংশটি জাপানিজ শিল্পকলায় উজ্জীবিত হয়ে জলজ বাগান বা ওয়াটার গার্ডেন নামকরণ করা হয়েছে। প্রথম অংশের বাগানটি প্রায় এক হেক্টর জায়গায় বিভিন্ন রঙ ও জাতের টিউলিপ, অরিয়েন্টাল পপি, আইরিশ এবং আরো অনেক ফুলে সুরভিত। যা চিত্রশিল্পী মনেটের বর্ণিল ছবি আঁকায় অনেক রসদ যুগিয়েছে। আর জলজ বাগানে মনেটের বিখ্যাত চিত্রকর্মের আদলে একটি জাপানিজ ব্রিজের রেপ্লিকা রয়েছে যা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। পুকুরের চারপাশে কার্নিশের ধারে চেরি, রডেন্ড্রন, আইরিশ ফুলের গাছ সহ আরো অনেক সুন্দর ফুলের গাছ লাগানো আছে, যা মনেট গার্ডেনের রুপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। মনেটের জলজ বাগানের মূল আকর্ষন হলো এর মাঝে ফুটে থাকা অপুর্ব শাপলা ফুল। এই বাগানের রুপ আহরন করার সময় অবশ্যই মনেটের বাড়িটির ভিতরের চিত্র কর্ম, স্টুডিও এবং জাপানিজ চিত্রকর্ম দেখে নিতে ভুলবেন না। মনেট গার্ডেন পহেলা এপ্রিল থেকে পহেলা নভেম্বর সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিটের মূল্য ১০ ইউরো আর ৭ বছরের অধিক শিশুদের জন্য ৫ ইউরো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *