ধর্ষণের দায় ও দোষারোপের রাজনীতি


খন্দকার হাবীব আহসান :

ধর্ষণ সংঘটিত হওয়ার পরিধি, স্থান, সময় বা ব্যক্তির বিশেষ কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। হোক ইউরোপ-আমেরিকা বা আফ্রিকা-এশিয়া, উন্নত বা অনুন্নত সব সমাজেই ধর্ষণ বা নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে।

সময় বিবেচনায় যৌনক্রিয়া আদিম চাহিদা হওয়ায় বিকৃত যৌন চাহিদাসম্পন্ন মানসিকভাবে পশুবৃত্তি লালন করা কুলাঙ্গাররা সব সময়ই ছিল, সভ্যতার উন্নয়নের কারণে ধর্ষণের বিপক্ষে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ তৈরির সংস্কৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে ক্রমশ এই যা।

অন্যদিকে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধার্মিক-অধার্মিক, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক বা অন্য কোনো শ্রেণি বিবেচনায় ধর্ষক চেনার নির্দিষ্ট উপায় নেই। তবে অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোত ধর্ষণের কারণ হিসেবে মাদকাশক্তি, অশিক্ষা, পারিবারিক বা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সংঘটিত বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে আসছে। তবে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে এটা যেমন সত্য তেমনি ধর্ষণের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর এবং সাধারণ মানুষের সোচ্চার হওয়ার সামাজিক পরিবেশও তৈরি হয়েছে এটা মিথ্যা নয়।

ধর্ষণের শিকার হওয়া অধিকাংশ নারীই সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য ধর্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন না। ধর্ষক কর্তৃক ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং ভুক্তভোগী নানা উপায়ে ব্লাকমেইলের শিকার হওয়ার কারণে সমাজের বেশির ভাগ ধর্ষকের চেহারা পর্দার আড়ালে। ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েও অনেক নারী পুনরায় ধর্ষণ বা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে।

এমনকি চলমান সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থী ছাত্র অধিকার পরিষদের হাসান আল মামুনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনলে ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নূর ঘটনা চেপে না রাখলে ভুক্তভোগীকে সমাজের সামনে পতিতা হিসেবে প্রমাণ করে দেওয়ার হুমকি দেন তাদের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সশরীরে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে নির্যাতন-লাঞ্ছনার বর্ণনা তুলে ধরেন। শুধু যে রাজনৈতিক কর্মীরাই ধর্ষণ করে তা নয়, দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং অরাজনৈতিক অনেক লোকই এই নিকৃষ্ট কাজটি করে থাকে। সব দলের মধ্যেই রয়েছে এই হীন কাজটি করার প্রবণতা।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে গৃহবধূকে শ্লীলতাহানি ধর্ষণচেষ্টা ও অমানবিক নিষ্ঠুর নির্যাতন, লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে বিধবা নারীকে গণধর্ষণ, ভোলার চরফ্যাশনে গৃহবধূকে ধর্ষণ, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, খাগড়াছড়ি এবং সাভারে ধর্ষণের ঘটনাসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যায় আমরা সকলেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি। কিন্তু এ সকল ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষক কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা কোন পেশায় রয়েছেন সেটি কি আসলেই মুখ্য!

ধর্ষণের দায় কি শুধু ধর্ষকেরই নয়! ধর্ষক যে দলেরই হোক তার বিচার চাইতে ঐ রাজনৈতিক দল সোচ্চার কি না বা রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাকে কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কি না সেটি নিয়ে কথা থাকতে পারে কিন্তু ধর্ষণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দোষারোপ না করে বরং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিবাদ জারি রাখাটাই মুখ্য নয় কি!

ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন ধর্ষণের অভিযোগ গ্রহণের জন্য নিরাপদ ও অধিকতর সহজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে ধর্ষকের বিচার কার্যকর করার ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে তেমনি নারীদের ওপর নির্যাতনমূলক ঘটনাগুলোতে সর্বস্তরে আমাদের প্রতিরোধ চলমান রেখে নারীবান্ধব সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও আমাদের মা, বোন, স্ত্রীরা যাতে নিরাপদ থাকে সেটি নিশ্চিত করতে, রাষ্ট্র ও আমাদের সন্তানদের পারিবারিক শিক্ষা প্রদানে যৌথ ভূমিকা পালন বাধ্যতামূলক। ধর্ষণ ইস্যুতে রাজনৈতিক পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে দোষারোপের রাজনীতি করে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন নয় বরং ধর্ষণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার উদ্যোগই হোক আমাদের প্রজন্মের সম্মিলিত এজেন্ডা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *