বিশ্বনবী (সা.) এর উদারতা ও মহানুভবতা

মুফতি আবু আবদুল্লাহ :

আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল-আহজাব ২১)। হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির জন্য মডেল। সর্বোচ্চ আধুনিক মডেল। অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ। তিনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। অবিস্মরণীয় ক্ষমা, উদারতা, মহানুভবতা, বিনয়-বিনম্রতা, সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা দিয়েই বর্বর আরব জাতির আস্থাভাজন হয়েছিলেন তিনি। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তুমি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সুরা আল-কালাম ৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সকলের সাথে সদাচরণ করে দুনিয়ার বুকে নজিরবিহীন আদর্শ স্থাপন করেছেন। সর্বোত্তম আদর্শের বাস্তবায়নকারী ও প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি। বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে।

তৎকালীন সমাজের শোচনীয় অবস্থা দেখে ১৭ বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সেবাসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের দুর্বল, নিরীহ, দরিদ্র, বিধবা ও অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, অন্যায়-দুষ্কর্ম প্রতিরোধ করা। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। নবুয়তের পূর্বে ২৩ বছর তিনি এভাবেই সমাজের কল্যাণে উদারতা ও মহানুভবতার স্বাক্ষর রাখেন। ‘হজরে আসওয়াদ’কে কেন্দ্র করে কুরাইশদের মাঝে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রূপ নিয়েছিল। মোহাম্মদ (সা.) বিশ্বস্ততা, উদারতা ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মীমাংসার ভার নবীজির ওপর ন্যস্ত করে মক্কার উগ্র কুরাইশরা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচক্ষণতার সাথে এমন এক ফয়সালা দিলেন, যাতে সবাই খুশি হলেন। এক অনিবার্য ভয়াবহ যুদ্ধ থেকে সমাজকে রক্ষা করলেন তিনি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা মানুষের সাথে উদার মনে মিশতেন। হাসিমুখে কথা বলতেন। সদালাপ করতেন। তাঁর মধুর বচনে সবাই অভিভূত হতো। ক্ষুধার্তদের খাবার খাওয়ানোর উপদেশ দেন তিনি। বিশ্বনবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, সালামের বহুল প্রচলন করো এবং এসব কাজের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সহিহ বুখারি)।

নবীজির উদারতা ও মহানুভবতায় সিক্ত হজরত আনাস রা. বলেন, ‘আমি ১০ বছর আল্লাহর রাসুলের খেদমত করেছি। আমার কোনো কাজে আপত্তি করে তিনি কখনো বলেননি, এমন কেন করলে? বা এমন করোনি কেন?’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। হজরত খাদিজা রা. উকাজ মেলা থেকে জায়েদকে কিনে এনেছিলেন। তিনি বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্নেহ-মমতায় বড় হতে লাগলেন। বাবা-চাচা তাকে বিপুল ধনসম্পদের বিনিময়ে ফেরত নিতে এলে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা সত্ত্বেও তিনি তাদের সাথে যাননি। বরং তাদেরকে বলেছিলেন, আমি মহান ব্যক্তির মহানুভবতা ও উদারতা সম্পর্কে অবগত। তাঁর সান্নিধ্যের বিনিময়ে দুনিয়ার অন্য কোনো সান্নিধ্য আমার কাম্য নয়।’ (মিশকাত)।

মোহাম্মদ মুস্তফা (সা.) অমুসলিম সংখ্যালঘুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। নিজ নিজ ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মালয়কে সুরক্ষিত রাখার সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। কোনো অমুসলিমের ওপর তিনি ইসলামকে চাপিয়ে দেননি। হেকমত ও চারিত্রিক মাধুর্য দিয়েই তিনি ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দিতেন। এ জন্য তিনি জীবনে অনেক যাতনা-লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন, কিন্তু কোনো দিনই ব্যক্তিগত কারণে কোনো অমুসলিমের প্রতি প্রতিশোধ নেননি। বিশ্বনবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যে কোনো অমুসলিমকে কষ্ট দিল আমি তার বিরুদ্ধে (অমুসলিমের) বাদী হব।

এক ইহুদি অমুসলিম কিশোর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করত। একবার ওই কিশোর অসুস্থ হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তার শিয়রে বসলেন। তাকে ইসলাম গ্রহণ করতে আহ্বান জানালেন। সে তখন নিজের বাবার দিকে তাকাল। বাবা বলল, তুমি আবুল কাসেমের কথা মেনে নাও। এবার ছেলেটি ইসলাম গ্রহণ করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বললেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর। তিনি ছেলেটিকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন।’ (সহিহ বুখারি)।

একবার নাজরানের একদল নাছারা মহানবী (সা.)-এর কাছে মেহমান হিসেবে আগমন করে। তিনি মসজিদে নববিতে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি তাদের নিজেদের উপাসনা করার জন্য এবং নিজ এলাকায় গির্জা নির্মাণ, মেরামত ও পাদ্রি নিয়োগের অনুমতি দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করতেন ইসলামের চরম শত্রুদের অন্তরগুলোকে আল্লাহ যেন ইসলামের দিকে ধাবিত করেন।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, একদা আবু তোফায়েল ও তার সঙ্গীরা এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, (ইয়েমেনের) দাউস গোত্রের লোকরা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং কুফরি করেছে। আপনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। উপস্থিত লোকরা বলতে লাগল- দাউসের লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেছে। দাউস ধ্বংস হয়ে গেছে। নবী কারিম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বদদোয়া না করে তাদের জন্য দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি দাউস গোত্রের লোকদের হেদায়েত দিন এবং তাদের (আমার কাছে) এনে দিন (সহিহ বুখারি)।

মহানবী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে কাফের-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই তাঁকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। ফলে শত বাধা-বিপত্তি ও বিপদসংকুুল পথ পাড়ি দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম বিজয়ী আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে নিজেদের জীবনকে গড়ে তুললে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা মিলবে। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে আদর্শিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *