শুধু প্রাণ নেই…

শেখ তাজুল ইসলাম :

এই শহরেও ছিল রিকশার টানা ক্রিং ক্রিং শব্দ, হাজারো মানুষের কোলাহল, ছিল জানা-অজানা অনেক গল্প, নীরবে হারিয়ে যেতে থাকা কিছু মানুষ ও কিছু ভালোবাসা।

করোনায় দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও হারিয়েছে তার চিরচেনা রূপ। এ যেন অচেনা এক ক্যাম্পাস। অদ্ভুত এক বিরানভূমিতে রূপ নিয়েছে চিরচেনা এই ক্যাম্পাস।

এখানে একটু আগে আগেই আসে শীত। ঘুরে দেখা যায়, ক্যাস্পাসজুড়ে নেমেছে হালকা কুয়াশা। কিন্তু পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এখানে হাঁটতে দেখা যায়নি এখনো কাউকে। হাঁটতে দেখা যায়নি জিমনেশিয়ামের পেছনের রাস্তাটায় সেই কুয়াশায় ভেজা বড় বড় ঘাসের মাঝখান দিয়ে, কাউকেই দেখা যায়নি মনপুরায় বসে কিচির-মিচির করতে থাকা হাজার হাজার অতিথি পাখির ডাক শুনতে। ভোরের কুয়াশায় ভেজা বকুল ফুল কুড়াতেও আসে না কেউ। সন্ধ্যায় ক্যাফেটেরিয়ার সামনে বসে গান শুনতে, ক্যাফেটেরিয়ার ভেতর গ্রুপস্টাডির জন্যও খুঁজে পাওয়া যায়নি কাউকে।

মুক্তমঞ্চেও কোনো হৈচৈ নেই আজকাল। শূন্যই পড়ে আছে প্রান্তিকে যাওয়ার পথে টিচার্স কোয়ার্টারের সামনের দোলনাটাও। ভিড় জমে না বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রর সঙ্গে ছবি তোলার জন্যও। অযথা সেলফি তোলার দৃশ্য কমই চোখে পড়ে। ট্রান্সপোর্ট, বটতলায় বসে না কোনো আড্ডা। সেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডায়, গল্পে মেতে উঠতে দেখা যায় না আর কাউকে।

কিছু দিন ধরে আবার দিনরাত গুড়ি গুড়ি কখনো থেকে থেকে মুষলধারে বৃষ্টিও হচ্ছে এই নগরীতে। কিন্তু তখনও বিশ মাইল থেকে চৌরঙ্গী কিংবা এমএইচ হলের ওই রাস্তাতে দেখা মিলছে না বৃষ্টিস্নাত কোনো পথিকের। নৌকা ভাসতে দেখা যায় না বিশ মাইলের লেকটাতেও। চারু ছায়ায় হিজল গাছের নিচে বসে রাতে বিদ্যুৎ চমকানো দেখে না আর কেউ। সারারাত বৃষ্টি আর মেঘের গর্জন কারো কানেও পৌঁছায় না আর। কিন্তু ঠিকই পুরান রেজিস্ট্রারের পেছনে সন্ধ্যাবেলায় হাজার হাজার মিটিমিটি জ্বলতে থাকা জোনাক পোকাগুলো আগের মতো আলো দেয়।

ট্রান্সপোর্টের পেছনের কাঁঠাল গাছটাও যেন কতো সহস্র বছর ধরে একা দাঁড়িয়ে আছে, যেন কেউ কখনোই তার নিচে বসে সুখ-দুঃখের অনুভূতি প্রকাশ করেনি!

সুনসান এই নগরীতে এখন চারদিক থেকে ভেসে আসে শুধু পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। টিয়া পাখির ঝাঁক যেন তাদের বিরামহীন চিৎকার থামায় না। ভরদুপুরেও চলার পথে হুট করেই সাক্ষাৎ মেলে শিয়ালের। ঝোপ-ঝাড়ে বাসা বেঁধেছে দোয়েল, ঘুঘু, শালিক, ডাহুকসহ হাজারো পাখি। গাছের ডালগুলোতে খেলা করছে কাঠবিড়ালি। পুকুরগুলোতে ফুটেছে লাল শাপলা। ছাতিম আর কাঠগোলাপের গন্ধে রীতিমতো মাতাল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় বৃন্দাবন ও টারজানের পথে হাঁটতে গেলে।

কুকুরগুলোও যেন অলসতা করেই কাটিয়ে দেয় তাদের সময়। অপেক্ষায় থাকে কখন তাদের অচেনা-অজানা ওই গাড়িতে করে খাবার নিয়ে আসা হবে। ক্যাম্পাসের লেকগুলোতে সারাদিন ছিপ নিয়ে বসে থেকে দিন কাটে কিছু মানুষের। এদিকে বহুক্রোশ দূরে তাদের এই দ্বিতীয় বাড়িটাতে ফেরার আশায় প্রহর গুনছে কিছু মানুষ। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে থাকা শত স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায় কিছু মানুষকে। যেন এখানে আসতে পারলেই হাফ ছেড়ে বাঁচতে পারবেন তারা। হয়তো ক্যাম্পাস থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়ে যাওয়া কিছু মানুষও একইভাবে এখনো অনুভব করেন তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসকে। কারণ, জাহাঙ্গীরনগরকে ছাড়তে পারলেও জাহাঙ্গীরনগর কাউকে ছাড়ে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *