তিন ধরনের মানুষ জান্নাত থেকে বঞ্চিত

মুফতি নাঈম কাসেমী :

আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন একমাত্র আল্লাহপাকের ইবাদত করার জন্য। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের যা আদেশ করেছেন, তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন, তা বর্জন করাই হলো ইবাদত। যেমন কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু আদেশ করেছেন, তা পালন করো এবং যেগুলো থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলো বর্জন করো।’

আর মানুষ যদি সঠিকভাবে তা পালন ও বর্জন করতে পারে, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী নিয়ামত জান্নাত। আর যদি তারা সঠিকভাবে পালনীয় বিষয়গুলো পালন করতে না পারে এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো বর্জন করতে না পারে, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তিন প্রকার মানুষের জন্য জান্নাত হারাম। অর্থাৎ তিনটা কাজ এমন রয়েছে যেগুলো করলে জাহান্নাম অবধারিত।

১. মুদমিনুল খমর তথা মদপান করা। ২. আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা। ৩. দাইয়ুস ।

  • মদপান করা সম্পূর্ণভাবে হারাম। এ ব্যাপারে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কুল্লু মুসকির হারাম তথা সমস্ত নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম। অন্য হাদিসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যেই সম্প্রদায়ের মধ্যে মদপানের অভ্যাস থাকবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। মদ যদিও ইসলামের প্রাথমিক সময়ে হালাল ছিল, কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এটাকে ধাপে ধাপে হারাম করে দিয়েছেন।

আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, সমস্ত নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম। এক হাদিসে হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে জাহান্নামিদের পচা রক্ত ও পুঁজ পান করাবেন।’

অনেক ভয়াবহ অবস্থা হবে তখন। দুনিয়াতে মানুষ সাধারণ দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না। আর জাহান্নামে কীভাবে এই পচা রক্ত সহ্য করবে?

আরেক হাদিসে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, এমন ব্যক্তি গুনাহ মাফ হবার পর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করলেও সে জান্নাতি শরাব থেকে মাহরুম হবে। জান্নাতে যাবার পরেও একজন মানুষ জান্নাতি শরাব পান করতে পারবে না এর চেয়ে আফসোস ও পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?

আজ বর্তমান সময়ে এই মদ ও নেশা জাতীয় জিনিসের কারণে পুরো সমাজ, বিশেষ করে যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আরো অনেক অপরাধ, অশ্লীলতা, এই মদের কারণে সমাজে দিন দিন বেড়েই চলছে।

যদি সমাজের প্রতিটি মানুষ এ বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে পারে তাহলে সমাজের অনেক অপরাধ কমে যাবে। সমাজ থেকে, এই দেশ থেকে দুর্ভিক্ষও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমাদের দেশকে যদি আমরা উন্নত আয়ের দেশে পরিণত করতে চাই, তাহলে এই মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা প্রয়োজন। তাই সবাইকে অনুরোধ করব, আসুন আমরা সবাই সব ধরনের নেশা থেকে বেঁচে থাকি ও সবাইকে বিরত রাখতে চেষ্টা করি।

  • দ্বিতীয় বিষয় হলো- আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না করা।

হাদিসে পাকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়াতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের কিছু বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। এই বন্ধনগুলো অটুট রাখা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিষয়ে খুব গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

আল্লাহ তা’য়ালা হাদিসে কুদসিতে বলেন, ‘আমি আল্লাহ, আমি আত্মীয়তার বন্ধনকে আমার নামের অংশ থেকে সৃষ্টি করেছি, সুতরাং যে এই সম্পর্ক বজায় রাখবে তার সাথে আমি রহমতের সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে ব্যক্তি এই সম্পর্ক নষ্ট করবে আমিও তার সাথে আমার রহমতের সম্পর্ক নষ্ট করে দেব।’

আল্লাহ তা’য়ালা যদি কোনো মানুষকে রহমতের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করেন, তাহলে ওই মানুষটার দুনিয়া ও আখিরাত ধংস হয়ে যাবে। তাই আমাদের সবার উচিত আমাদের পরস্পরের আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো ভালোভাবে অটুট রাখা। সব সময় খেয়াল রাখা, কোনো কারণে যেন আমাদের মধুর সম্পর্ক নষ্ট না হয়। যদি কোনো আত্মীয় আমার সাথে রাগ করে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়, তাহলে আমি আগ বাড়িয়ে তার সাথে আমার সম্পর্ক আরো মজবুত করার চেষ্টা করব।

হাদিসে পাকে আছে, যদি কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ হয়ে যায়, তাহলে পরস্পর একে অপরকে বেশি বেশি সালাম দাও। ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উভয়ের অন্তরে মুহাব্বত সৃষ্টি করে দেবেন।

পিতামাতার সাথে সন্তানের সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, ভাই-বোনের সম্পর্ক, চাচাদের সাথে সম্পর্ক, ফুফু-খালাদের সাথে সম্পর্কসহ সব সম্পর্কই সুন্দরভাবে বজায় রাখা প্রতিটি মানুষের জন্য অতীব জরুরি। অনেক সময় মানুষ সামান্য একটি স্বার্থের কারণে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। ফলে জীবনে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পরবর্তীতে আফসোস করতে হয়। আর আল্লাহ তা’য়ালা এমন মানুষের ওপর খুবই রাগান্বিত হন। তাই আমাদের সবার উচিত নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও পরস্পরের সম্পর্ক অটুট রাখা। প্রত্যেক মানুষের মাঝে যদি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকে, তাহলেই সম্ভব সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

  • তৃতীয় ব্যক্তি হলো ‘দাইয়ুস’ তথা এমন মানুষ, যে তার পরিবারের কেউ কোনো গুনাহের কাজ করলে তাদের বাধা দেয় না। যেমন কারো স্ত্রী ফরজ গোসল করে না অথবা বেপর্দা হয়ে ঘোরাফেরা করে। বাজারে, রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরা করে। পর পুরুষের সাথে কথা বলে বা ওঠাবসা করে এগুলো থেকে সে নিষেধ করে না। এই ব্যক্তিই দাইয়ুস। এমন মানুষের জন্য জান্নাত হারাম। তাই প্রত্যেক বাবার উচিত, তার মেয়েকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখা। প্রত্যেক ভাইয়ের উচিত তার বোনকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখা।

আর আমরা যদি আমাদের স্ত্রী, কন্যা, বোনদের সকল প্রকার গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারি এবং শরীয় পর্দার আড়ালে রাখতে পারি, তাহলে সমাজ থেকে ধর্ষণ, ইভটিজিং ও পরকীয়ার মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি অনেকটাই শেষ হয়ে যাবে। কাল কিয়ামতের ময়দানেও কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তাই আসুন আমরা সবাই উপরোক্ত তিনটি বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে বর্জন করি। যদি আমরা সবাই মিলেমিশে এই কাজগুলো বর্জন করতে পারি, তাহলে আমাদের সমাজব্যবস্থা অনেক সুন্দর হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : পরিচালক, জামিয়া শায়খ আরশাদ মাদানী, ময়মনসিংহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *