হত্যাকাণ্ডের সাত মাস পর আসামির জবানবন্দিতে পাঁচ পুলিশের নাম


রাজশাহী প্রতিনিধি :

চলতি বছরের ২২ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মার চরে পাওয়া যায় একটি লাশ। রফিকুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তি বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলাও হয়। পরে তার স্ত্রী থানায় হত্যা মামলা করেন। ঘটনার সাত মাস পর এ মামলায় গ্রেপ্তার ইসাহাক আলী ওরফে ইসা নামের এক ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, হেরোইনের চালান ধরার ঘটনায় পুলিশের পাঁচজন সদস্যের হাতে খুন হন রফিকুল।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পোলাডাঙা গাইনাপাড়া গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে নিহত রফিকুল ইসলাম (৩২) টাকার বিনিময়ে সীমান্ত থেকে হেরোইন এনে দেওয়ার কাজ করতেন।

রফিকুল হত্যা মামলায় আটক ইসা (২৮) আজ শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর মহল্লার ইসা একজন বড় মাপের হেরোইন ব্যবসায়ী।

ইসার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গোদাগাড়ী থানার তিনজন উপপরিদর্শক (এসআই) ও দুজন কনস্টেবল (সঙ্গত কারণে তাদের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো না) হেরোইন বহনকারী রফিকুল ইসলামকে হত্যা করেন। ঘটনার সময় তিনি (ইসা) সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

আদালত সূত্র জানায়, রফিকুলের কাছ থেকে হেরোইন উদ্ধারের অভিযানের বিষয়ে আগে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই ২১ মার্চ রাতে ওই পাঁচ পুলিশ সদস্য অভিযানে যান।

পরদিন ২২ মার্চ সকালে গোদাগাড়ীর মাটিকাটা দেওয়ানপাড়া এলাকার পদ্মার চর থেকে রফিকুলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সেদিনই থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে ১৭ জুন নিহতের স্ত্রী রুমিসা খাতুন বাদি হয়ে দুজনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আবদুল মালেকের ছেলে শরিফুল ইসলাম (৩২) এবং একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে জামাল উদ্দিন (৩২)। এদের মধ্যে জামালকে পুলিশ ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে।

যে রাতে রফিকুল খুন হন সেই রাতেই জামালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। রাতে দায়ের করা ওই মামলায় পলাতক আসামি হিসেবে নিহত রফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়, যার লাশ সকালে পাওয়া যায় পদ্মার চরে। পরে মাদক মামলায় পুলিশ জামালকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়। রিমান্ড শেষে জামাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জামাল আদালতে বলেছিলেন, ২১ মার্চ রাতে তিনি ও রফিকুল পদ্মা নদীর ওপারের সীমান্ত থেকে হেরোইন নিয়ে আসছিলেন। পদ্মার চরে হঠাৎ বজ্রপাত হয়। তখন তিনি রফিকুলকে হারিয়ে ফেলেন এবং নিজে অচেতন হয়ে পড়েন। পুলিশ তাকে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে। পরে তিনি জানতে পারেন রফিকুল বজ্রপাতে মারা গেছেন।

প্রথমে রফিকুল হত্যা মামলার তদন্ত করছিলেন গোদাগাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক নিত্যপদ দাস। ওই সময় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার নেয়। ২৩ জুন আদেশ হওয়ার পর ৭ জুলাই পিবিআইকে থানা থেকে মামলার নথিপত্র হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে পিবিআইয়ের রাজশাহী কার্যালয়ের এসআই জামাল উদ্দিন মামলাটির তদন্ত করছেন। তিনি সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে আসছিলেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি ইসাহাক আলী ইসাসহ তিনজনকে আটক করেন। অন্য দুজন হলেন, গোদাগাড়ীর মাদারপুর মহল্লার আজিজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম (২৫) এবং একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে মাহাবুর আলী (৩১)। তাদের পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইসা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হন।

শুক্রবার সকালে তিনজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। দুপুরে রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল মাহমুদের কাছে ইসা জবানবন্দি দিতে শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। ইসার জবানবন্দি শেষ হলে তিনজনকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইসা তার জবানবন্দিতে নিজেকে কৃষক বলে দাবি করেন। তবে তিনি বলেন, হেরোইন নেওয়ার জন্য তিনি ভারতের মুর্শিদাবাদের কাশেম নামের এক ব্যক্তিকে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কাশেম প্রথমে তাকে নকল হেরোইন পাঠান। এরপর তিনি নিজে ভারতে কাশেমের কাছে যান। তখন কাশেম তাকে আসল হেরোইন পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। গত মার্চে ৫০০ গ্রাম হেরোইনের ওই চালান সীমান্ত পার হয়ে আসে। ইসা পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি পুলিশের সঙ্গে চুক্তি করেন, হেরোইনের একটি চালান তিনি ধরিয়ে দেবেন। বিনিময়ে তাকে দুই লাখ টাকা দিতে হবে।

এ চুক্তির পর রফিকুল ও জামাল যখন তার (ইসার) হেরোইন নিয়ে আসছিলেন তখন ইসা ওই তিন এসআই ও দুই কনস্টেবলকে নিয়ে মাটিকাটা দেওয়ানপাড়া সিঁড়িঘাট এলাকায় যান। জামাল ও রফিকুল হেরোইন নিয়ে এলে তাদের ধরে ফেলে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও মারধরের একপর্যায়ে মারা যান রফিকুল। পুলিশ তার লাশ ফেলে আসে চরে। আর রফিকুলের সঙ্গী জামালকে ধরে ১০০ গ্রাম হেরোইনের মামলা দেয়া হয়। অবশিষ্ট ৪০০ গ্রাম হেরোইন পুলিশ আত্মসাৎ করে।

ইসা তার জবানবন্দিতে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি ঘটে রাত সাড়ে ৯টার দিকে। রফিকুলের মৃত্যু দেখে ইসা ভয় পেয়ে পুলিশকে তার এক আত্মীয় মারা গেছেন জানিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সরে পড়েন। এরপর পুলিশ আর যোগাযোগ করেনি তার সঙ্গে। তাকে দুই লাখ টাকাও দেয়নি। পরে তিনি জানতে পারেন, রফিকুলের মৃত্যুর কারণ বজ্রপাত বলে চালানো হয়েছে। জামালও মাদক মামলার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন যে রফিকুল বজ্রপাতে মারা গেছেন। তবে নিহত রফিকুলের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।

রফিকুলের সঙ্গে জামালও হেরোইন নিয়ে এসেছিলেন বলে তার স্ত্রী রুমিসা খাতুন যে হত্যা মামলা করেন, তাতে আসামি হিসেব জামালসহ দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়। পিবিআই তদন্তভার পাওয়ার আগে গোদাগাড়ী থানার পুলিশ এ মামলাতেও জামালকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তবে হত্যা মামলায় জামাল স্বীকারোক্তি দেননি। আর হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আরেক আসামি শরিফুল এখনো পলাতক।

গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম বলেন, তিনি গোদাগাড়ীতে যোগ দেওয়ার কদিন পর পদ্মার চরে রফিকুলের লাশটি পাওয়া যায়। তিনি বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে প্রথমে শোনেন। এরপর হত্যা মামলা হলে জামালকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর কদিন পরই মামলাটি পিবিআইতে চলে যায়। ওই হত্যাকাণ্ডে কোনো পুলিশ জড়িত কি না সে ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।

জানা গেছে, জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে একজন এসআই ও একজন কনস্টেবল গোদাগাড়ী থানায় এখনো আছেন। আর মাস দুয়েক আগে জেলাজুড়ে বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের ‘বদলি অভিযান’ শুরু হলে অন্য দুজন এসআই ও একজন কনস্টেবল অন্যত্র বদলি হয়ে যান। একজন এসআই বদলি হন পাবনার ঈশ্বরদী থানায়। অন্য দুজন কোথায় আছেন তা জানা যায়নি।

রফিকুল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, মামলায় এ পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এদের মধ্যে শুধু ইসা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতের কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

রফিকুল হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে গোদাগাড়ীর ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এসআই জামাল। এরপর তাকে চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, ডাকলেই গ্রামপুলিশ রুহুলকে আবার আসতে হবে। কিন্তু চেয়ারম্যানের জিম্মায় যাওয়ার পর রুহুল লাপাত্তা। এ প্রসঙ্গে এসআই জামাল বলেন, রুহুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।

রফিকুল খুনের ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যের নাম আসার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি তিনি রাজশাহী আসার আগের। তবে কেউ জবানবন্দিতে পুলিশের নাম দিলেই যে পুলিশ জড়িত সেটা বলা যাবে না। আবার জবানবন্দি দিয়ে থাকলে পুলিশ জড়িত নয়, তাও বলা যাবে না। আমরা তদন্ত করে দেখব। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *