আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিধ্বস্ত পল্লি


মো. সোহেল দেওয়ান :

আধুনিকতা বর্তমান বহুল আলোচিত শব্দগুলোর একটি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এর ব্যবহার লক্ষণীয়। ক্রমেই এর ব্যাপকতা বাড়ছে। পশ্চিমাদের মুখেই শব্দটির প্রথম উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীকালে এর ঢেউ ইউরোপ, আমেরিকা ঘুরে এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসেও লাগে। যদিও আধুনিকতার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই তবুও আমরা এভাবে বলতে পারি যে, ‘আধুনিকতা হলো মানসিক ও প্রযুক্তিগত ইতিবাচক পরিবর্তন।’ আজ থেকে শত বছর আগে যে মানুষ আধুনিক ছিল না কিংবা সহস্র বছর পরও যে মানুষ নিজেদের আধুনিক বলে দাবি করবে না এ কথা আমরা বলতে পারি না। কারণ প্রত্যেক প্রজন্মই তার সময়ে আধুনিক।

আধুনিক সব বিস্ময়কর আবিষ্কার এবং তার অবদানে মানব সভ্যতার আমূল পরিবর্তনের কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই । বিশ্বজুড়ে এখন প্রযুক্তির জয়জয়কার। তবে সময় এসেছে মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখার। আধুনিকতা একদিকে যেমন আমাদের জীবনমান সহজ থেকে সহজতর করেছে, অন্যদিকে এর দরুন প্রাত্যহিক জীবন বিশেষ করে গ্রামীণ জীবন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নেমে এসেছে নানা দুর্যোগ। প্রকৃতির এ নাটকীয় পরিবর্তনের দমকা হাওয়ায় ছিন্নভিন্ন হয়েছে প্রকৃতি, জীবন ও মানুষ।

আধুনিকতা একটি দার্শনিক আন্দোলন, যা ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমা সমাজে সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক রূপান্তরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রবণতা ও পরিবর্তনের সাথে সাথে উত্থান লাভ করে। যেসব ফ্যাক্টর আধুনিকতাবাদকে বর্তমান রূপ দান করে তার মধ্যে শিল্পভিত্তিক সমাজ গঠন, নগরের দ্রুত বিকাশ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্য। আধুনিকতাবাদ আলোকায়নের চিন্তাধারার অভ্রান্ততাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং অনেক আধুনিকবাদী ধর্মীয় বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করেন। সাধারণভাবে আধুনিকতাবাদের অন্তর্ভুক্ত সেইসব লোকের কাজ ও সৃষ্টিকর্ম যারা অনুভব করেন ঐতিহ্যবাহী শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, দর্শন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, দৈনন্দিন কাজকর্ম এমনকি বিজ্ঞানও পুরোপুরি শিল্পায়িত সমাজের উত্থানের ফলে নতুন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও সেকেলে হয়ে পড়েছিল।

তারই জের কি আজকের আধুনিকতা? আমরা যদি পল্লি ও তার জনজীবনের দিকে চোখ রাখি তাহলে দেখতে পাব প্রযুক্তি ও মানসিক উভয় দিক থেকেই বিধ্বস্ত এক পল্লির ছায়ামূর্তি। ‘যে আগুন রন্ধনকার্যে সাহায্য করে তার দহনে যে কাষ্ঠ নিধন হয় তার ক্ষতিও কোনো অংশে কম নয়’। আধুনিকতার উত্তাপ যখন পল্লি জীবনে এসে লাগে তখন নানাভাবে আমরা দগ্ধ হই। কোমলমতি কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বৃক্ষরাজি, পাখ-পাখালি, নদ-নদী, ফসলের মাঠ কোনো কিছুই এর দহন থেকে রক্ষা পায় না। আমরা যতই কংক্রিটের দালান গড়ি কিংবা শহরের দিকে ছুটি না কেন পল্লি-প্রকৃতি আবহমানকাল ধরেই আমাদের কাছে টানে। আমরা কল্পনাতেও পল্লির অপার সৌন্দর্যের স্বর্গরাজ্যে হারিয়ে যেতে ভালোবাসি। তাই তো কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী আধুনিকতায় পিষ্ট হয়ে লিখেছিলেন, ‘কভু ভাবি পল্লি-গ্রামে যাই/নাম ধাম সকল লুকাই।’ কিন্তু হায় সেই পল্লি আজ কই? আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে জীবনানন্দ দাশের হিজলবন, এখন আর সেখানে ঘুঘু ডাকে না কিংবা পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙে না। আম্রশাখে বসে কোকিলের সুরলহরিতে মাতে না পল্লি-পাড়া। অতিথি পাখিরা ফিরে যাওয়ার সময় সম্ভবত এদেরকে সাইবেরিয়া নিয়ে গেছে। শীতের সকালে ডিমের লাল কুসুমের মতো যদিও-বা সূর্য ওঠে, উঠোনে নরম মিষ্টি রোদে পিঠ পেতে বসে থাকার দৃশ্য চোখে পড়ে না। উলের পোশাক পরে মিষ্টি রোদের তোয়াক্কাও করে না আধুনিক মানুষ। রবীন্দ্রনাথের ছোট্ট নদীটি ভরাট হয়ে আজ বুকে ধারণ করে আছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা, তার চার দেয়ালে আটকা পরে হাঁসফাঁস করছে নব্য নাগরিক মানুষ। শুভ্র কাশবনে বসেছে ইন্ডাস্ট্রির মেলা, পাগল করা সে ফুরফুরে বাতাস সেখানে ঢেউ খেলে না। ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে নদীর বুকে ভাসতে দেখা যায় না পাল তোলা নৌকা। শোনা যায় না বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। বিষাক্ত কেমিক্যাল আর ইস্টিমারের বাজখাঁই আওয়াজে জলজ-জীবন এখন বিপন্ন প্রায়। আধুনিকতার ছোঁয়া এখন জসীমউদ্দীনের মামা বাড়িতেও। মামার বাড়ির রসের হাঁড়ি আর নেই। সেখানে আমগাছটির জায়গায় এখন দালান উঠেছে বহুতলা। তাই ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর আনন্দটা এখন কেবলি অতীত। আধুনিক সব নিত্য নতুন খাবার, যেমন চাইনিজ, জাপানিজ, ইতালিয়ানের ভিড়ে গ্রাম্য পিঠাপুলির ঠাঁই নেই। এখন পুথি, লোকগীতি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি বড্ড সেকেলে। কুলবধূ কিষানিরা রাত জেগে এখন আর ধান ভানে না কিংবা জ্যোৎস্না রাতে গল্প-গানের আসরের কোনায় বসে ঘোমটার নিচে মুচকি হাসে না। নকশিকাঁথায় ফোঁড় তোলে না অবসর কিষানি। ভিনদেশি সিরিয়াল গ্রাস করেছে সেসব সোনালি মুহূর্তগুলো। চুড়ি, পুঁতির মালা, খোঁপায় গোঁজা ফুল কিংবা লেস ফিতায় খোঁপা বাঁধা মেয়েটি এখন তামাশার পাত্রী। গ্রীষ্মের দুপুরে পুকুরের জলে ঝাপুরি খেলানো কিংবা খাতার কাগজ ছিঁড়ে মাঠে ঘুড়ি উড়ানো দুরন্ত কিশোর-কিশোরী আজ পিতা-মাতার কড়া নজরে আটকা পড়ে আছে। ইংরেজি মাধ্যমগুলোর জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রাম্য শিশুটি তৈরি করছে নতুন সাংস্কৃতিক সংকট। বৃষ্টির দিনে মাটির গর্ত থেকে বেরিয়ে আনন্দ মিছিল করতে থাকা জলাশয়ের ব্যাঙ পর্যন্ত আধুনিকতার লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি। ভোজন-পেয়ালায় আইটেম বাড়াতে তাদের গ্রাস করেছে আধুনিক সভ্য মানুষ। মঞ্জরি শুকিয়ে ফুল বাগানের অবস্থা দুর্বিষহ, চোখে পড়ে না হাজারো ফুলের মহাসমাবেশ। প্রকৃতি উপহার দিচ্ছে ফুলহীন বসন্ত। এখন বাসন্তী পুজায়ও পাওয়া যায় না পদ্মফুল। দূরদর্শী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বোধ হয় পূর্বেই আভাস পেয়েছিলেন যে, আধুনিককালে বসন্তেও ফুল না ফোটার সম্ভাবনা আছে। তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক/আজ বসন্ত।’

আধুনিকবাদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো আত্মসচেতনতা এবং সামাজিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য নিয়ে বিদ্রূপ, যা প্রায়ই কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে নিয়ে যেত এবং ছবি, কবিতা ও দালান ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা পদ্ধতি ও উপকরণের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করত। আধুনিকতা স্পষ্টতই বাস্তবতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে এবং অতীতের কাজগুলোকে নতুন করে দেখা, লেখা, বিবেচনা ও বিদ্রূপ করে। বিশেষ করে পশ্চিমা জনগণ, যারা একে সমাজে চিন্তার প্রগতিশীল ভাবধারা বলে মনে করে, যা মানুষকে ব্যবহারিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের পরিবেশ সৃষ্টি, উন্নয়ন ও পুনর্নির্মাণ করার ক্ষমতাকে স্বীকৃতি প্রদান করে। এদিক থেকে আধুনিকতাবাদ যা অগ্রগতিকে আটকে রাখছিল তা খুঁজে বের করার লক্ষ্যে বাণিজ্য থেকে দর্শন পর্যন্ত অস্তিত্বের প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্বিবেচনাকে এবং একই প্রান্তে পৌঁছানোর জন্য নতুন উপায়ে তা প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যে উৎসাহ দেয়। যদিও কিছু কিছু পণ্ডিত মনে করেন যে, আধুনিকতা বিশ শতকেও অব্যাহত হয়েছে, অন্যদের মতে এটি বিলম্বিত-আধুনিকতা বা উচ্চ আধুনিকতাবাদে পরিবর্তিত হয়েছে, যে জায়গা পরে উত্তর-আধুনিকতা দখল করে।

সেই কথিত উত্তরাধুনিক হতে গিয়ে আজ আমরা পল্লির মেঠোপথকে উপহার দিয়েছি যানজট। ফুল-ফসলের গন্ধের স্থলে আকাশ-বাতাস ভরে উঠেছে ধোঁয়ার গন্ধে। বনভূমি উজাড় করে নির্মাণ করা হচ্ছে কলকারখানা, সঠিক বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দূষিত হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, যার দরুন বাড়ছে নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব। অন্যদিকে তরুণ ছেলে-মেয়েরা আধুনিকতার নামে অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রয়োজনীয় বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অপ্রয়োজনে নষ্ট করছে তাদের মূল্যবান সময়, যা তরুণ প্রজন্মকে ফেলে দিয়েছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। দ্রুত তাল মেলাতে গিয়ে আমরা কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলেছি। এই ট্রেন্ড চলতে থাকলে একদিন আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে। তখন আমাদের নতুন প্রজন্ম পল্লির সৌন্দর্য খুঁজে পাবে কেবল কবির কবিতায়, দেখবে শিল্পীর তুলিতে আঁকা পল্লি-কঙ্কাল। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা যে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ করছি তারা আধুনিক হয়েছে বটে, তবে নিজস্বতা বিসর্জন দিয়ে নয়। তাই আমাদেরও উচিত পল্লির নিজস্বতা ধরে রেখে তার সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে ভেতরে ধারণ করার মধ্য দিয়ে আধুনিক হওয়া।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *