সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষায় নবীজির বিরল দৃষ্টান্ত


আবু আবদুল্লাহ :

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বব্যাপী শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপনের বিরল দৃষ্টান্ত। শান্তিপ্রতিষ্ঠায় তিনিই হলেন বিশ্বের একমাত্র মহামানব। মানুষের পারস্পরিক অভিবাদন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে শান্তিপ্রতিষ্ঠার অগ্রসেনানী তিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো কথা বলার আগেই সালাম দাও।’ অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। যার অর্থ হলো—আপনার ওপর শান্তি, অনুগ্রহ ও কল্যাণ নাজিল হোক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ঘোষণাই প্রমাণ করে যে, তিনি কী পরিমাণ শান্তিকামী ছিলেন!

আর যারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষিত সালামের বিরোধিতা করে, তারা মূলত শান্তির বিরোধিতা করছে। তারা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা চায়না; বরং সালামের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের তকমা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তির চেষ্টায় লিপ্ত তারা। আল্লাহ তাদের কুচক্রান্ত থেকে দেশ ও জাতিকে হেফাজত করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনভর অশান্তি-বিশৃঙ্খলা ও উগ্রতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই এ ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। দক্ষ সংগঠক হিসেবে বর্বর-অশান্ত আরবে বছরের পর বছর যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অত্যাচার ও উগ্রতা বন্ধে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গঠন করে ছিলেন এক অনন্য সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল’।

নবুয়তলাভের আগ থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধ্বংসাত্মক ও উগ্রকাজকে পছন্দ করতেন না। যার প্রেক্ষিতে তিনি কাবা ঘরে হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসে চরম উগ্রতা থেকে বাঁচিয়েছেন মক্কার গোত্রপতিদের। নবুয়তলাভের পরও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চরম জুলুম-অত্যাচারের স্বীকার হয়েও শান্তিপ্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজীবন অন্যায়, অবিচার ও হিংসাত্মক উগ্রতা দমনে সচেষ্ট ছিলেন। সমাজ পরিবর্তনে তিনি কখনই উচ্ছৃঙ্খলতা দেখাননি। দয়া, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। এ কারণেই আল্লাহতায়ালা কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করেছেন—‘(হে রাসূল!) নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজের জানের চরম দুশমনের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেননি। অন্য ধর্মের লোকদের প্রতিও বিন্দুমাত্র অবহেলা দেখাননি।

সাহাবায়ে কেরাম (রা)-এর হূদয়ের স্পন্দন মসজিদে নববী। যেখানে বসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সার্বিক কাজ তথা ইবাদত-বন্দেগি করতেন। সাহাবায়ে কেরামের মিলনমেলার স্থল ছিল মসজিদে নববী। সেখানের একটি ঘটনা থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শান্তি স্থাপনের প্রতীক। একদা মসজিদে নববীতে অন্য ধর্মের এক গ্রাম্য ব্যক্তি পেশাব করে দেয়। যা দেখে সাহাবায়ে কেরাম (রা) রেগে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে শান্তিতে পেশাব করতে দাও। লোকটি নিরাপদে পেশাব করল। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক বালতি পানি এনে জায়গাটি পরিষ্কার করালেন। এরপর লোকটিকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, এটি তো পেশাবের জায়গা নয়। নামাজ ও আল্লাহর জিকিরের জায়গা। এতে লোকটি তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলো। (বুখারি, ইবনে মাজাহ)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, তোমাদের সহজ ও বিনয়ী আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোরতা বা উগ্রতার জন্য পাঠানো হয়নি। (বুখারি শরিফ : ২২০)

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ছিলেন বিশ্বনবী। যিনি ছিলেন শান্তিশৃঙ্খলা স্থাপনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার জীবনেই রয়েছে উম্মতের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ ঘোষণা দেন—‘অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে রয়েছে উম্মতের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।’ যে জন্মভূমি থেকে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চরম নির্যাতন ও অত্যাচারিত হয়ে মদিনায় যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সে জন্মভূমি বিনা রক্তপাতে জয় করার পরও কারো প্রতি তিনি জুলুম করেননি। শক্তি, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কারো প্রতি কঠোরতা দেখাননি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটা বিশ্বব্যাপী ক্ষমা ও শান্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

বিদায় হজের ভাষণে বিশ্বের সেরা শান্তি ও শৃঙ্খলার বাণী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন। দুনিয়া থেকে চিরতরে উগ্রতা, অনৈক্য, অশান্তি, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলাকে নিষিদ্ধ করে উড়িয়েছেন শান্তি, সমপ্রীতি, উদারতা, মানবতা ও শৃঙ্খলার পতাকা। মাহে রবিউল আউয়াল হোক বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর জন্য শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অনন্য মাস। ইসলামই শান্তি ও শৃঙ্খলার এক অনন্য জীবনব্যবস্থা।

লেখক : আলেম, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *