আলামিনের প্রতারণার জাল বিশ্বের ৭০টি দেশে ছড়িয়ে

মহাকাল প্রতিবেদক :

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এক যুবক গড়ে তোলে প্রতারণার সিন্ডিকেট। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অনলাইনে অ্যাপসের মাধ্যমে শুরু করেন অবৈধ মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে সিন্ডিকেটটি বাংলাদেশসহ ৭০টি দেশে ছড়িয়ে দেয় ব্যবসাটি। রাতারাতি ৫ লাখ প্রবাসী ও বিদেশি গ্রাহকসহ ২২ লাখ গ্রাহক যুক্ত করে তারা। যাদের কাছ থেকে এরই মধ্যে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২৬৮ কোটি টাকা। এই টাকা বৈধ করার জন্য নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন জায়গায় কেনা হয়েছে জমি। মোটা অঙ্কের টাকা দেশের বাইরেও পাচার হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, এ চক্রের মূলহোতা আলামিন প্রধান। ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ নামে কোম্পানি খুলে এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সে। মাত্র এইচএসসি পাস করা আলামিন একসময় ডেসটিনিতে চাকরি করত। সেখান থেকেই প্রতারণার খুঁটিনাটি শেখে। ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতে থাকে। এ সময় তার এক বন্ধু তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা ধার নেন। এর কয়েক মাস পর ওই বন্ধু সঙ্গে ব্যক্তিগত হ্যারিয়ার গাড়ি নিয়ে দেখা করতে যায় আলামিন প্রধান। এতে হতবাক হয়ে যান ওই বন্ধু। এর কয়েক মাস আগে রাতারাতি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সে। ডেসটিনির প্রতারণার মাধ্যম ফলো করে ডিজিটাল রূপে ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ কোম্পানি খোলার পরিকল্পনা করে সে।

এরপর স্ত্রী শারমিন আক্তার, বন্ধু ইয়াছিন ও নিজের নামে ই-কমার্স ব্যবসার লাইসেন্স নিয়ে ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’-এর মাধ্যমে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এমএলএম ব্যবসা শুরু করে। প্রশাসন যাতে বুঝতে না পারে এটি এমএলএম ব্যবসা এ জন্য রেজিস্টার্ড গ্রাহকদের কাছে এসপিসি ব্র্যান্ডের নামে বিএসটিআই অনুমোদনের সিলযুক্ত বিভিন্ন পণ্য বিক্রি ও অনলাইনে বিজ্ঞাপন সাবমিট করার অপশন রাখা হয় অ্যাপসে। দেশীয় ‘আর্টিফিসিয়াল সফট’ নামে একটি আইটি কোম্পানি থেকে তৈরি করা হয় অ্যাপসটি। ভারতীয় আমাজন সার্ভারের মাধ্যমে করা হতো বুস্টিং। যাতে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা গ্রাহকরা নিয়মিত আপডেট পেতে পারেন। এ জন্য আমাজনকে মাসে ৭ হাজার ডলার দিতে হতো তাদের। আর গ্রাহকদের কাছ থেকে বিকাশ-নগদ-রকেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া টাকা জমা হতো আলামিন প্রধানের ৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। যেখানে মাত্র ১২ কোটি টাকা জমা রেখে বাকি টাকা পাচার, জমি ও গাড়ি কিনে সম্পদের পাহাড় গড়েছে সে।

গত সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’-এর এমডি ও সিইও আলামিন প্রধান এবং নির্বাহী অফিসার মো. জসিম গ্রেপ্তারের পর ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে একটি হ্যারিয়ার গাড়ি, দুটি পিকআপভ্যান, সার্ভারে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, রাউটার, দুটি পাসপোর্ট ও কোম্পানির বিভিন্ন কাগজপত্র জব্দ করা হয়।

এর আগে গত ২৬ অক্টোবর কলাবাগানের এফ হক টাওয়ারের ৬ তলায় কোম্পানির অফিসে অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলো কোম্পানিটির ম্যানেজার মো. মানিক মিয়া, ম্যানেজার (প্রোডাকশন) মো. তানভীর আহম্মেদ, সহকারী ম্যানেজার (প্রোডাকশন) মো. পাভেল সরকার ও অফিস সহকারী নাদিম মো. ইয়াসির উল্লাহ। কোম্পানির অফিসে অভিযানের পরের দিন ২৭ অক্টোবর কলাবাগান থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় গতকাল আলামিন প্রধান ও নির্বাহী অফিসার মো. জসিমের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালত আলামিন প্রধানের ৪ দিন ও জসিমের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে গতকাল মঙ্গলবার সকালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ই-কমার্সের লাইসেন্স নিয়ে যাত্রা করে চক্রটি। আলামিন প্রধান একসময় ডেসটিনিতে সক্রিয় ছিল। এই ১০ মাসে তারা সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগে উচ্চ কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে ২২ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ জন সদস্যের কাছ থেকে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তাদের ব্যবসা কার্যক্রম অনলাইন আ্যপভিত্তিক হওয়ায় বাংলাদেশের বাইরেও ১৭টি দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীর পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ বিদেশি সদস্য রয়েছেন।

অতিরিক্ত কমিশনার আরো বলেন, চক্রটি ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ ঠিকানার ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে শত শত পোস্টের মাধ্যমে ই-কমার্সের কথা বলে উচ্চমাত্রার কমিশনের লোভ দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। আগ্রহীরা গুগল প্লে-স্টোর থেকে একটি মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করেন। রেজিস্ট্রেশনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে আপলিংক আইডির রেফারেন্সে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট) নম্বরে প্রতি আইডির জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা করে দিতে হতো। গ্রাহকদের দেখানো হতো রেফার কমিশন, জেনারেশন কমিশন, রয়্যাল কমিশনের প্রলোভন।

এ ক্ষেত্রেও অবলম্বন করা হতো ডেসটিনির পদ্ধতি। রেফার্ড করা ব্যক্তি তার নিচের তিনটি আইডি থেকে ৪০০ টাকা করে কমিশন লাভ করবে। এরপর ওই তিনটি আইডি থেকে যখন ৩*৩=৯ আইডি হবে তখন আপলিংকের আইডি ২০ শতাংশ কমিশন পাবে। এরপর ডাউনলিংকের যত আইডি হবে তার আইডি ১০ শতাংশ হারে কমিশন পাবে, যা মূলত পিরামিড আকৃতির হয়। এ ধরনের ব্যবসা দেশের আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তিনি বলেন, চক্রটি এমএলএম ব্যবসা আড়াল করার জন্য নামমাত্র কয়েকটি পণ্য যেমন অ্যালোভেরা শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, চাল, ডাল, মরিচের গুঁড়া তাদের রেজিস্টার্ড সদস্যদের কাছে বিক্রি করত। তার লভ্যাংশ থেকে প্রতি আইডি হোল্ডারকে কোম্পানির বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখার বিনিময়ে ১০ টাকা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

ডিবির সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) নাজমুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যবসার নামে অ্যাপস ও ওয়েবসাইটভিত্তিক প্রতারণা ঠেকাতে ডিবি, সিআইডি ও সিটির সাইবার ইউনিট সব সময় নজরদারি রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ নামে প্রতারণামূলক কোম্পানির মূলহোতাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ ধরনের আরো বেশ কয়েকটি কোম্পানি আমাদের নজরদারিতে আছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

নিঃস্ব শত শত গ্রাহক : ‘এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস’ কোম্পানিতে শুরুর দিকে ইনভেস্ট করে লাভের মুখ দেখেন অনেকে। তাদের আয়ে প্রলুব্ধ হয়ে শত শত মানুষ শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে ইনভেস্ট করতে থাকেন, যা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন তারা। তেমনই একজন মিরপুরের বাসিন্দা আবু নাসিম। বন্ধুদের মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে পৈতৃক ভিটা বন্ধক রেখে ১ হাজার ২০০ টাকা করে প্রায় ৮৩ হাজার টাকায় মোট ৬৯টি আইডি কেনেন। লাভ তো দূরের কথা, সব টাকা হারিয়ে এখন নিঃস্ব আবু নাসিম। শুধু নাসিমই নন, সর্বস্ব বিক্রি করে এ ব্যবসায় আসা হাজারো ব্যক্তি রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। প্রতারকদের উপযুক্ত সাজার পাশাপাশি নিজেদের টাকা ফেরত চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *