কবি ও নন্দিত সম্পাদক আবুল হাসনাত


সালাম সালেহ উদদীন :

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার সঙ্গে আমার পরিচয় কবি শামসুর রাহমানের বাসায়। কবি লেখকদের পাশাপাশি সাহিত্য সম্পাদকরাও রাহমান ভাইয়ের বাসায় প্রায় নিয়মিত যেতেন। রাহমান ভাইয়ের কক্ষে ঢুকে দেখি, শান্ত স্বভাবের একজন ভদ্র লোক বসে আছেন। রাহমান ভাই বললেন, ও হচ্ছে সালাম সালেহ উদদীন, ভালো গল্প লিখে, আজকের কাগজের সাহিত্য সম্পাদক। হাসনাত ভাই আমার দিকে তাকালেন। তার তাকানোর মধ্যে কোনো কৌতূহল বা উৎসাহ দৃশ্যমান হলো না। তিনি বললেন, আপনার গল্প আমি ছেপেছি। আপনার মুক্তিযুদ্ধের ওপর ফলাফল গল্পটি ব্যতিক্রম। এবার বুঝতে পারলাম তিনি সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক, আবুল হাসনাত। এর পর আরো দুবার রাহমান ভাইয়ের বাসায় দেখা হয়েছে তার সঙ্গে। বরাবরই তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন। পরে নিশ্চিত হলাম তিনি এমনই। সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে তিনি আমার ৬টি গল্প প্রকাশ করেছেন। এরপর কালি ও কলমে চারটি গল্প। অবাক ব্যাপার যে, কালি ও কলমের গল্পের সম্মানি তিনি লোকমারফত যায়যায়দিন অফিসে পাঠিয়ে দিতেন।

সম্পাদক হিসেবে তার যে মহৎ গুণ তা এ দেশের সাহিত্য সংশ্লিষ্টরা অবগত রয়েছেন। তা হলো তিনি মুখ চিনে লেখা প্রকাশ করতেন না। সাহিত্যে গোষ্ঠীপ্রীতি বলতে যা বোঝায় তিনি তার বাইরে ছিলেন। এখন যারা সাহিত্য সম্পাদক তারা মুখ চেনা ছাড়া লেখা প্রকাশ করেন না, নিজস্ব গোষ্ঠীর বাইরে কারো লেখা প্রকাশের মানসিকতা বা ইচ্ছে তাদের নেই। এভাবেই তারা বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে চায়, ত্বরান্বিত করতে চায় এর বিকাশকে। তবে সবাই নয়, বেশির ভাগ। যারা এসব করেন তারা সাহিত্য সম্পাদক হওয়ার যোগ্য কি না তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এদের বলেছেন ‘বাছুর সম্পাদক’।

একবার কবি সমরেশ দেবনাথ গেলেন এক সাহিত্য সম্পাদকের কাছে। বললেন, আমার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ছবিসহ আমার ওপর লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করুন। ওই সম্পাদক বললেন, আপনি এমন কী লিখেছেন যে, আপনার ওপর কাভারেজ দিতে হবে। অত্যন্ত মর্মাহত অবস্থায় তিনি আমার কাছে এলেন। আমি বললাম একজন কবির ৬০ বছর পূর্তি এটা অনেক বড় ব্যাপার। আপনি ভুল জায়গায় গিয়েছেন। আপনার মর্যাদা তিনি বোঝেননি। আমি ছবিসহ ভালোভাবে লেখাটি প্রকাশ করলাম। সৈয়দ শামসুল হক ১৯৯৩ সালে আমার নেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন. ‘একজন লেখক ৪০ বছর ধরে লিখছেন। কী লিখছেন তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি লিখছেন। তাকে তুমি অবহেলা করতে পার না। তার শ্রমের মূল্য রয়েছে।’ এই ধরনের অবজ্ঞাসূচক অবমূল্যায়নের কাজ এ দেশের অনেক ‘বাছুর সম্পাদক’ করে থাকে। এমন অভিযোগ আমার কাছে প্রচুর এসেছে। যারা তাদের সাহিত্য সম্পাদক বানিয়েছে, তাদের শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা বা বোধ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন লেখক সৃষ্টির ব্যাপারে তাদের কোনো রকম আগ্রহ কিংবা দায়বদ্ধতা নেই।

আমাদের মনে রাখা দরকার, সাহিত্য জীবনের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে। সুতরাং সাহিত্য সম্পাদক হতে হলে যে পঠনপাঠন জ্ঞান সাহিত্য বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বীক্ষা ও চিন্তা, সম্পাদনা দক্ষতা থাকা দরকার- তা এ দেশে কজনার রয়েছে। আহসান হাবীবের পর এই যোগ্যতা আবুল হাসনাতের ছিল। যার কারণে একজন সৎ নিরপেক্ষ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি সব মহলে সমাদৃত ও নন্দিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। তার নেতৃত্বে সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলম এবং বেঙ্গল বই এ দেশের প্রকাশনা জগতে বিশেষ স্থান অর্জন করেছে।

আবুল হাসনাত ১৯৪৫ সালের ১৭ জুলাই পুরান ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনডাঙায়, ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল। তার প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য, জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য। শিশু ও কিশোরদের নিয়ে রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়, টুকু ও সমুদ্রের গল্প, যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে, রানুর দুঃখ-ভালোবাসা। তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন। আমৃতু্য তিনি সাহিত্য পত্রিকা কালি ও কলমের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘শিল্প ও শিল্পী’রও সম্পাদক তিনি। মাহমুদ আল জামান নামেও তিনি লেখালেখি করতেন। ১৯৮২ সালে টুকু ও সমুদ্রের গল্পের জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। ২০১৪ সালে অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলো। তবে জীবনের শেষ প্রান্তে বইমেলা ২০২০-এ জার্নিম্যান বুকস্‌ তার আত্মজীবনী প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি ও সংস্কৃতি জগতের এক বিশ্বস্ত ভাষ্য আমাদের উপহার দিয়েছেন।

লেখালেখি ও সম্পাদনার সূত্রে কলকাতার সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়সহ অনেক সেরা লেখক, কবি ও শিল্পীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। স্বদেশে কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান থেকে শুরু করে নতুন ও তরুণ সব লেখকেরই প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। কেউ তার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারত না।

আবুল হাসনাত ছিলেন বামপন্থি রাজনীতিক ও নেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক। ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। ছাত্রজীবনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পরপর তিনটি কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। সাহিত্যের পাশাপাশি শিল্পকলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। বাংলাদেশের সেরা শিল্পীদের শিল্পকলা তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। কয়েক দশক ধরে ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ছায়ানটের কমিটিতেও সহসভাপতি ও উপদেষ্টা হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এ দেশের সাহিত্য সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল মুখ। গোষ্ঠীপ্রীতির স্বর্ণযুগে নিরপেক্ষ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কবি আহসান হাবীবের পর তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন লেখক পাঠকের হৃদয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *