কারাগারে রাজার হালে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি


মহাকাল রিপোর্ট :
কারাগারে রাজার হালেই আছেন চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত জিবরান তায়েবী হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইয়াসিন রহমান টিটু। ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম নগরীতে নৃশংসভাবে খুন হন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ মহাপরিদর্শক টি এ খানের ছেলে জিবরান তায়েবী। ২০০৭ সালে ঐ মামলার রায়ে অন্যতম আসামি ইয়াসিন রহমান টিটুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় তিনি যুক্তরাজ্যে ছিলেন।

চার বছর পর ২০১১ সালে দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাভোগ শুরু করেন। অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে এক বছরের বেশি সময় তিনি হাসপাতালে কাটান। পরে এ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট হলে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। তবে কারাগারেও বেশ ভালোই আছেন হত্যা মামলার আসামি টিটু।

একাধিক সিনিয়র আইনজীবীর মতে, বাংলাদেশের কারাবিধি অনুযায়ী নৃশংস অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা সাধারণত ডিভিশন পায় না। কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করে নিজেকে ‘বিশেষ মর্যাদাবান’ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে সেই সুবিধা ভোগ করছেন টিটু। জানা গেছে, কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি শিল্পপতি খলিলুর রহমান সাজাপ্রাপ্ত টিটুর পিতা। টিটু নিজেও একজন ব্যবসায়ী। হত্যা মামলায় কারাগারে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকার কেওয়াই স্টিল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি। তবে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে কারাভোগ শুরু করার পর টিটুকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ পদ ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু পদ ছাড়লেও ব্যবসার হাল ছাড়েননি টিটু। কারাগারে বসেই দীর্ঘদিন ধরে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য তত্ত্বাবধান করছেন।

টিটুর ডিভিশন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চট্টগ্রামে নতুন এসেছি। তিনি (টিটু) কীভাবে ডিভিশন পেয়েছেন তা আমার জানা নেই। প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে হয়তো তিনি আদালত কিংবা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিভিশন পাবেন।’ কারাগারে ডিভিশন প্রসঙ্গে সাবেক চট্টগ্রাম মহানগর পিপি আবদুস সাত্তার বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী বিশেষ সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা জেলখানায় ডিভিশন পাওয়ার যোগ্য। তবে হত্যা বা এজাতীয় নৃশংস অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সাধারণত ডিভিশন পাবেন না।

এদিকে টিটুর বিরুদ্ধে কারাগারে বসেই নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। আদালতে হত্যা মামলার রায়ের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হলেও একপর্যায়ে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে তিনি এক বছরের বেশি সময় হাসপাতালে কাটিয়েছেন। পরে এ বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। জানা গেছে, বছর দুয়েক আগে কেওয়াই স্টিলের নির্বাহী পরিচালক মুনির হোসেন খানকে কারাগারের মধ্যেই মারধর করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন টিটু। লাঞ্ছিত হওয়ার অপমানে টিটুর প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেন মুনির। কিন্তু পদত্যাগ করার পর মুনিরের বিপদ আরো বাড়ে।

মুনিরের পরিবারের অভিযোগ, মুনিরকে শায়েস্তা করার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় এ পর্যন্ত ২৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গত এক বছরের বেশি সময় তিনি চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি আছেন। কিছু মামলায় টিটুর পিতামাতাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন করেছেন মনিরের পিতা চট্টগ্রাম বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন খান।

এ বিষয়ে গতকাল শনিবার কথা হয় মোয়াজ্জেম হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের বিরুদ্ধে একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৪টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ২০টিতেই আমার ছেলে জামিন পেয়েছে। যখনই তার জামিন নিয়ে জেল থেকে বের হয়ে আসার সময় হয়, তখন নতুন আরেকটা মামলা দেয়। এভাবে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে আমার ছেলেকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। আমার ছেলের বিরুদ্ধে কেওয়াই স্টিলের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠানে অডিট আছে, অ্যাকাউন্টস শাখা আছে। তারা কোথায় ছিল? কখন এবং কীভাবে আমার ছেলে এত টাকা আত্মসাত্ করল?’

মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, ‘টিটু ও তার পরিবার অনেক শক্তিশালী। আইন ও প্রশাসন সব তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমি তাদের সঙ্গে পারব না। কিন্তু আমার যা কিছু আছে, তার সবকিছুর বিনিময়ে আমি আমার ছেলের মুক্তি চাই। আমার ছেলে আমেরিকার নাগরিক। সে মুক্তি পেলে আমেরিকায় চলে যাবে। এই দেশে আর থাকবে না।’ উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট এলাকায় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে খুন হন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা টি এ খানের ছেলে জিবরান তায়েবি। এ ঘটনায় মামলা করেন তার স্ত্রী তিতলী নন্দিনী। ২০০২ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামি ইয়াসিন রহমান টিটুকে বেকসুর খালাস দিয়ে অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে উচ্চ আদালত ২০০৭ সালের ২৮ মার্চ ইয়াসিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা করে। পরে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর যুক্তরাজ্য থেকে এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন টিটু। আত্মসমর্পণের পর অসুস্থতার অজুহাতে ইয়াসিন এক বছর আড়াই মাস হাসপাতালে ছিলেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।

২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল বিকালে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ইয়াসিন রহমান টিটু চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুনির হোসেন খানকে মারধর করেন। ঘটনাটি ঘটে জেল সুপারের কক্ষের পাশে কনফারেন্স রুমে প্রতিষ্ঠানের আরো কয়েক জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *