আমজাদ হত্যা মামলা : ২১ বছর পর ১০ আসামির ফাঁসির রায়


চট্টগ্রাম প্রতিনিধি | ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৮:২৩ |

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের দুইবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনকে হত্যার প্রায় ২১ বছর পর মামলার রায় হয়েছে। উপজেলার অন্য একটি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যানসহ ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

গতকাল রবিবার চট্টগ্রামের বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ কে এম মোজাম্মেল হক এই রায় দেন।

এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দেশের বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত, যাতে সাবেক মন্ত্রীসহ ১৪ জনকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। এর প্রায় ছয় বছর পর আলোচিত আরেকটি ঘটনার বিচারে ১০ আসামির ফাঁসির রায় এলো।

১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর রাত ১২টায় উপজেলার মির্জাখীল দরবার শরিফের ওরস চলাকালে দরবারের ফটকে বসে আলাপ করার সময় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করেছিল আমজাদ হোসেনকে (৪৫)। ওই সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। এ ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।

হত্যাকাণ্ডের পর আমজাদের স্ত্রী রওশন আক্তার বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার বিচার পেতে বাদীকে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া রায়ে বাদীপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।

মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা হলেন সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, জাহেদ, আবু মো. রাশেদ, মানিক, জিল্লুর রহমান, মো. রফিক, ফারুক আহমেদ, জসিম উদ্দিন, বশির আহমেদ ওরফে ডাকাত বশির ও তারেক। তাঁদের মধ্যে বশির ও তারেক পলাতক।

যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামিরা হলেন মো. ইদ্রিস, হারুন মিয়া, আইয়ুব, মোরশেদ আলম ও ইদ্রিস। এর মধ্যে শেষের তিনজন পলাতক।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন আবু তাহের, শায়ের, মোস্তাক আহমেদ ও আবদুল মালেক।

হত্যাকাণ্ডের সময় আসামি নিজাম উদ্দিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি সাতকানিয়া সদর ইউনিয়ন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আরেক আসামি বশির আহমেদ সম্পর্কে নিজামের মামা। তিনিও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বশির বর্তমানে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পদে রয়েছেন। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনও করেছিলেন তিনি।

মামলার নথিসূত্রে জানা গেছে, আমজাদ হত্যা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে পুলিশ। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে। ২০০০ সালের ২২ ডিসেম্বর সিআইডি ২০ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০০৪ সালে ২৫ অক্টোবর মামলার অভিযোগ গঠন করেন আদালত। একাধিকবার আদালত পরিবর্তনের পর গত বছরের মার্চ মাসে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর গত ১১ নভেম্বর অধিকতর যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য প্রস্তুত হয়। ওই দিন নিজামসহ ১০ আসামির জামিন বাতিল করে তাঁদের কারাগারে পাঠান আদালত। গত ২৬ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল; কিন্তু ওই সময় রায় ঘোষিত হয়নি। গতকাল ধার্য দিনে মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।

চার মেয়ে ও এক ছেলের জনক আমজাদের বাড়ি মির্জাখীল দরবারের উত্তর পাশে। রায় ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করে তাঁর ভাতিজা অ্যাডভোকেট আবদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বিচার পেয়ে আমরা সন্তুষ্ট। আসামিরা বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার নানা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। এ কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। না হলে আমরা আরো আগেই ন্যায়বিচার পেতাম।’

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবুল মাজন মাসুম সাংবাদিকদের বলেন, ‘দরবারের পূর্ব পাশে প্রভাবশালী লুত্ফর রহমান চৌধুরীর বাড়ি। এলাকাবাসীর ওপর তাঁর জুলুমের প্রতিবাদ করেছিলেন চেয়ারম্যান আমজাদ। এ কারণে লুত্ফর চেয়ারম্যানের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৯৯ সালের ২৬ আগস্ট সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এলাকায় পুলিশ ডাকাতবিরোধী যৌথ অভিযান চালায়। পুলিশকে সহযোগিতা করেছিলেন আমজাদ। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন ডাকাত আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে নিজাম উদ্দিন ও বশির আহমেদের নাম প্রকাশ করে। ডাকাতি বন্ধে আমজাদ সক্রিয় হওয়ায় বশির ও নিজাম ক্ষিপ্ত হয়। এরপর তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

আইনজীবী বলেন, এই হত্যা মামলায় লুত্ফর রহমানও আসামি ছিলেন। কিন্তু বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *