সাইবার অপরাধ ও নারী


ফারহানা নওশিন তিতলী | প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২৫ |

তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ যথেষ্ট এগিয়ে। শহরের সীমা ছাড়িয়ে এখন গ্রামেও নতুন নতুন প্রযুক্তির মোবাইল, ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির নানা সুফল ক্রমেই মানুষের সহজলভ্য হচ্ছে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সমান্তরাল হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ।

সাইবার অপরাধ মূলত কী? সহজ ভাষায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটিয়ে সাইবার স্পেসে অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হওয়াই সাইবার অপরাধ। তথ্য জালিয়াতি, আইডি হ্যাকিং, অপপ্রচার, ছবির বিকৃতি, পর্নোগ্রাফি, পাইরেসি, সাইবার বুলিং, চাঁদাবাজি ইত্যাদি।

ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে আমাদের দেশের সব শ্রেণির মানুষ এখন স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে। যেখানে একজন উচ্চশিক্ষিত ও নিরক্ষর দুজন মানুষই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, সেখানে এর ভারসাম্যতা বজায় থাকছে না। ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খোলা, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রচার, শরীর ও পোশাক নিয়ে অশালীন মন্তব্য, যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের হুমকি, শপিং মলের ট্রায়াল রুম থেকে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিপীড়ন ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়া ইত্যাদি হয়রানির শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার নারী। আমাদের দেশের নারীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কতটা হয়রানির শিকার হতে হয়, সেটা যে কোনো সেলিব্রিটির পোস্টে পাবলিক কমেন্ট পড়লেই বোঝা যায়। কিন্তু খুবই দুঃখজনক যে, এরকম ঘটনা মাঝেমাঝে কিছুদিনের জন্য আলোড়ন তুললেও বাংলাদেশে সাইবার অপরাধে শাস্তি হয়েছে—এমন নজির অনেকটা কম অথচ প্রতিনিয়ত এর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশু। তারা যেমন প্রতারণার শিকার হচ্ছে, তেমনি তাদের ব্যক্তিগত জীবনও হয়ে পড়ছে দুর্বিষহ। এমন ঘটনাতে ভুক্তভোগীর জীবন যেমন দুর্বিষহ হচ্ছে ঠিক তেমনি মানসিকভাবেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো নারীর সঙ্গে এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সেই নারীর আর বাইরে স্বাভাবিক চলাফেরার উপায় থাকে না। অনেক সময় এমন অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে অনেকের জীবনের উজ্জ্বল প্রদীপ নিভে যায়। কারণ, আমাদের সমাজের এখনো অনেক মানুষ আছে, যারা এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীর দিকে আঙুল তোলে। এক্ষেত্রে শুধু ভুক্তভোগী নয়, তার পরিবারকেও বিপাকে পড়তে হয়। ফলে আত্মহত্যার মতো নির্মমতাকে মেনে নিতে হয়।

বাংলাদেশে ২০০৬ সালে প্রথম সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে এই আইন সংশোধন করা হয়। এই আইনে কারো অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তোলা এবং তা প্রকাশ করার অপরাধে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু সাইবার হয়রানিতে ভুক্তভোগীদের অনেকে জানে না এর বিরুদ্ধে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। লোকলজ্জার ভয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হবে না ভেবে অভিযোগ করে না অনেকে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্তর্জালে যুক্ত হতে গিয়ে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ‘ভ্রান্তির-জালে জড়িয়ে পড়ছে সাধারণ অসংখ্য মানুষ। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্রমণাত্মকভাবে পরিকল্পনা করে কিছু কুরুচিসম্পন্ন মানুষ প্রতিদিন অনেক মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। অসাবধানতা ও আইনি পদক্ষেপে উদাসীনতার কারণে এ ধরনের অপরাধকে অপরাধীরা নিরাপদ ভাবে। ইন্টারনেট ব্যবহার করে অথচ কখনো এ ধরনের হয়রানির স্বিকার হননি এমন নারী দেশে খুব কমই আছেন। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলার জন্য সচেতন থাকার কোনো উপায়ন্তর নেই। নিজের গোপন ছবি বা গোপন তথ্য বিশ্বাস করে কাউকেই দেওয়া উচিত নয়। কারণ, বিগত সময় ঘটে যাওয়া বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই বিশ্বাসের ফল।

নিজের ব্যবহূত যে কোনো প্রযুক্তির পাসওয়ার্ড যেন কোনোভাবে অন্য কারো কাছে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শিশু-কিশোরী যারা নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করছে, তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারের ভাইবোন অথবা বাবা-মাকে প্রযুক্তির সুফল ও কুফল—এ দুই বিষয়েই ধারণা দিতে হবে। খেলার মাঠের পরিবর্তে ইন্টারনেট ব্যবহারে নিরুত্সাহিত করতে হবে। সর্বোপরি সাইবার হয়ারানির শিকার হলে কীভাবে আইনিব্যবস্থা নিতে হয়, সে বিষয়ে প্রত্যেকটি মানুষের জানা উচিত। সাইবার স্পেসে নারীদের হয়রানি রোধে গোপনীয়তা রক্ষা করে আইনি সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিতে সম্প্র্রতি পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নামক একটি ওয়েবসাইটের সূচনা হয়েছে এবং এখান থেকে অনেকে সুবিচার পেয়েছে বলেও জানা গেছে। একজন নারী উত্ত্যক্তকারী যখন পার পেয়ে যায়, তখন তা আরো নারী নিগ্রহের জন্ম দেয় সেক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে আপস করে অপরাধকে না বাড়িয়ে প্রতিবাদ করুন। এমন ঘটনায় যে সমাজের মানুষ আপনাকে ছিঃ ছিঃ করবে, প্রতিবাদ করার পর নির্দোষ প্রমাণিত হলে তারাই আপনাকে বাহবা দেবে। তাই নিজের ও পরিবারের সুরক্ষায় এক চুলও ছাড় নয়।

লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *